
মাসুম বিল্লাহ-খুলনা :
খুলনা জেলার রূপসা উপজেলাধীন ২নং শ্রীফলতলা ইউনিয়নের ৭নং ও ৮নং ওয়ার্ডের বাসিন্দারা দীর্ঘকাল ধরে এক অদ্ভুত ভৌগোলিক ও প্রশাসনিক জটিলতার শিকার হয়ে আসছেন। ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ‘আঁঠারো বাকী’ নদী এই দুই ওয়ার্ডের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে দুই ভাগে বিভক্ত করে দিয়েছে। ফলে সরকারি সেবা ও ভোটাধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন কয়েক হাজার মানুষ। এই সমস্যা সমাধানে ওয়ার্ড দুটির সীমানা পুনঃনির্ধারণ এবং নতুন ভোটকেন্দ্র স্থাপনের জন্য জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় এলাকাবাসী।
ভৌগোলিক জটিলতা ও নাগরিক ভোগান্তি: সরেজমিনে দেখা গেছে, আঁঠারো বাকী নদীর উত্তর ও দক্ষিণ—উভয় পাশেই ৭নং ও ৮নং ওয়ার্ডের অংশ বিশেষ অবস্থিত। অর্থাৎ, একই ওয়ার্ডের কিছু অংশ নদীর একপারে এবং বাকি অংশ অন্যপারে। এই ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার কারণে ইউনিয়ন পরিষদের ত্রাণ বিতরণ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদারকি চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, নদীর কারণে উন্নয়ন বরাদ্দ সমহারে বন্টন হয় না। জনপ্রতিনিধিদের পক্ষেও নিয়মিত নদী পার হয়ে অন্য পাড়ের নাগরিকদের সেবা দেওয়া কষ্টকর হয়ে পড়ে। বিশেষ করে দক্ষিণ নন্দনপুর, মোজাব্বারপুর ও পশ্চিম নন্দনপুরের বাসিন্দারা সবচেয়ে বেশি অবহেলিত থাকছেন।
নির্বাচনের সময় ‘অমানবিক’ পরিস্থিতি
সবচেয়ে বড় সংকট দেখা দেয় নির্বাচনের সময়। বর্তমান সীমানা অনুযায়ী, ৭নং ও ৮নং ওয়ার্ডের জন্য মাত্র একটি ভোটকেন্দ্র নির্ধারিত। ফলে নদীর এক পাড়ের ভোটারদের উত্তাল নদী পার হয়ে অন্য পাড়ে গিয়ে ভোট দিতে হয়। স্থানীয়রা জানান, বিগত নির্বাচনগুলোতে নদী পার হয়ে ভোট দিতে যাওয়ার সময় ভোটাররা বিভিন্ন পক্ষের হুমকি-ধমকি ও শারীরিক লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন। নদীর কারণে নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, নদীর দক্ষিণ পাশে অবস্থিত ৮নং ওয়ার্ডের ভোটাররা জাতীয় নির্বাচনে নন্দনপুর দাখিল মাদ্রাসায় ভোট দিলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তাদের ৭নং ওয়ার্ডে ভোট দিতে হয়। এই অসামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার প্রয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে।
প্রস্তাবিত সমাধান: সীমানা পুনঃনির্ধারণ ও নতুন কেন্দ্র: এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে একটি ধারণাপত্রে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের কাছে দাবি জানিয়েছে। তাদের মূল দাবিগুলো হলো:
১. সীমানা পুনঃনির্ধারণ: নদীর এক পাশের (পূর্ব/উত্তর) ৭নং ও ৮নং ওয়ার্ডের অংশগুলো মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ওয়ার্ড এবং নদীর অপর প্রান্তের (পশ্চিম/দক্ষিণ) অংশগুলো মিলিয়ে আরেকটি স্বতন্ত্র ওয়ার্ড গঠন করা। এতে ওয়ার্ডের সংখ্যা বাড়বে না, কিন্তু প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।
২. নতুন ভোটকেন্দ্র: নদীর দক্ষিণ পাড়ে অবস্থিত ভোটারদের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘবে ‘আলহাজ্ব সিদ্দিক আহম্মেদ জমাদ্দার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’ প্রাঙ্গণে একটি নতুন ভোটকেন্দ্র স্থাপন করা।
জনমত
এলাকাবাসীর মতে, জনপ্রতিনিধিরা যদি নিজ নিজ পাড়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে সেবা প্রদানের সুযোগ পান, তবেই এই অবহেলিত জনপদ অর্থনৈতিকভাবে আরও সমৃদ্ধ হবে। উল্লেখ্য যে, এই ইউনিয়নে প্রায় ৫০টির বেশি ইটের ভাটা রয়েছে যেখানে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ কর্মরত।
এই মানবিক ও প্রশাসনিক সমস্যা সমাধানে নির্বাচন কমিশন এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ৭নং ও ৮নং ওয়ার্ডের সর্বস্তরের জনসাধারণ। তারা বিশ্বাস করেন, বর্তমান সরকার নাগরিক সুবিধা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে এই যৌক্তিক দাবি দ্রুত বাস্তবায়ন করবে।

