
রিয়া মনি :
দীর্ঘ ২২ বছর ধরে গৃহকর্মী হিসেবে বন্দি রেখে অমানবিক নির্যাতন এবং পরবর্তীতে ধর্ষণের শিকার হওয়ার অভিযোগ তুলে প্রশাসনের কাছে ন্যায়বিচারের দাবিতে অঝোর ধারায় কেঁদেছেন ভুক্তভোগী কুমু বেগম (২৯). আজ ঢাকার মিরপুর ১০ নম্বরের সেনপাড়া পর্বতার ৬ নম্বর রোডের ১৫ নম্বর বাড়িতে অবস্থিত ‘মিরপুর প্রেস ক্লাব’-এ আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই লোমহর্ষক ও অমানবিক নির্যাতনের বিবরণ তুলে ধরেন.
সংবাদ সম্মেলনে কুমু বেগম অভিযোগ করেন, গৃহকর্তা মো: জাহাঙ্গীর লতিফ (৫০) তাকে শুধু দীর্ঘ দুই দশক ধরে বিনাশ্রমেই খাটাননি, বরং তার ওপর পাশবিক নির্যাতন ও ধর্ষণ চালিয়েছেন. আজ সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত সাংবাদিকদের সামনে তিনি এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং অভিযুক্তের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন.
শৈশব থেকে বন্দি জীবন ও নির্মম নির্যাতনের ইতিহাস
সংবাদ সম্মেলন ও পূর্বে প্রেরিত আইনি নোটিশের বিবরণ থেকে জানা যায়, কুমু বেগমের পৈতৃক বাড়ি চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ এলাকায় হলেও শৈশবেই মা-বাবা ও আত্মীয়স্বজন হারিয়ে তিনি সম্পূর্ণ অসহায় হয়ে পড়েন. ২০০৫ সালের দিকে মাত্র ৭ বছর বয়সে এক আত্মীয়ের মাধ্যমে তাকে ঢাকার কাফরুল থানাধীন উত্তর ইব্রাহিমপুরের মুন্সি বাড়ির বাসিন্দা মো: জাহাঙ্গীর লতিফের বাসায় গৃহপরিচারিকার কাজে দেওয়া হয়.
বিনাশ্রমে খাটানো: দীর্ঘ ২২ বছর দিন-রাত পশুর মতো খাটানো হলেও তাকে কাজের বিনিময়ে কোনো পারিশ্রমিক বা টাকা-পয়সা দেওয়া হয়নি.
শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন: প্রাথমিক কিছু দিন ভালো আচরণ করা হলেও বয়স বাড়ার সাথে সাথে তার ওপর প্রতিনিয়ত অমানবিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হতো.
ধর্ষণের শিকার: একপর্যায়ে গৃহকর্তা জাহাঙ্গীর লতিফ কর্তৃক তিনি লম্পটতা ও ধর্ষণের শিকার হন, যা লোকলজ্জা ও ভয়ের কারণে এতদিন চেপে রাখতে বাধ্য হয়েছিলেন.
বিয়ের খরচ এড়াতে সুপরিকল্পিতভাবে বিতাড়ন
কুমু বেগমের বিয়ের বয়স হলে বিবাদীরা প্রথমে বিয়ের খরচ বহনের মৌখিক প্রতিশ্রুতি দিলেও পরবর্তীতে টাকা বাঁচানোর জন্য এক জঘন্য চক্রান্তে লিপ্ত হয়. জাহাঙ্গীর লতিফের স্ত্রী রোমানা জাহাঙ্গীর运行 রুমকি (৪৫) এবং তাদের দুই কন্যা জেবা রাইসা (২৩) ও দিয়া রাইসা (২০) একতাবদ্ধ হয়ে কুমুর কাজের অজুহাতে প্রতিনিয়ত মারধর ও গালমন্দ শুরু করেন, যাতে তিনি নিজে থেকেই বাসা ছেড়ে চলে যান.
এরই ধারাবাহিকতায়, ২০২৪ সালের ৩১ জুলাই বিবাদীরা অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে একটি টিকিট কেটে কুমু বেগমকে সম্পূর্ণ খালি হাতে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে বাসে তুলে দেন. দীর্ঘ প্রায় দুই দশক ধরে একটি পরিবারকে নিরলস সেবা দেওয়ার পর বিদায়বেলায় তাকে রাস্তায় এক বেলার খাবারের টাকা পর্যন্ত দেওয়া হয়নি. চট্টগ্রামে পৌঁছে তিনি এক পূর্বপরিচিত সাক্ষীর আশ্রয়ে কোনোমতে প্রাণরক্ষা করেন.
আইনি নোটিশ ও আর্থিক ক্ষতিপূরণ দাবি
এর আগে গত ২২ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে চট্টগ্রামের জজ কোর্টের আইনজীবী সুরাইয়া নার্গিসের মাধ্যমে অভিযুক্ত জাহাঙ্গীর লতিফ ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে একটি লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়েছিল.
শ্রম আইন অনুযায়ী বিগত ১৯ বছরের বকেয়া বেতন (মাসিক ৩,০০০ টাকা হারে) সর্বমোট ৬,৮৪,০০০ টাকা এবং বিয়ের খরচ বাবদ প্রতিশ্রুতি দেওয়া ২,০০,০০০ টাকাসহ সর্বমোট ৮,৮৪,০০০ টাকা অবিলম্বে পরিশোধের দাবি জানানো হয়েছে.
কঠোর মামলার হুঁশিয়ারি
সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী কুমু বেগম স্পষ্ট জানান, লিগ্যাল নোটিশ প্রাপ্তির নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তার পাওনা বুঝিয়ে না দিলে এবং এই পাশবিক নির্যাতনের বিচার না হলে তিনি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ, শ্রম আইন লঙ্ঘন, নারী নির্যাতন, ধর্ষণ ও মানব পাচার আইনে কঠোর ফৌজদারি মামলা দায়ের করবেন.
ইতিমধ্যেই এই নোটিশের অনুলিপি কাফরুল থানা, পাঁচলাইশ থানা, বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন, সিএমপি পুলিশ কমিশনার এবং র্যাব-৭ কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে. সংবাদ সম্মেলন শেষে ভুক্তভোগী নারী প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে তার নিরাপত্তা ও দ্রুত ন্যায়বিচারের আকুল আবেদন জানান।

