
১৯২৪ সালে ওসমানীয় খিলাফত বিলুপ্ত হওয়ার পর, মুস্তাফা কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্বাধীন নতুন তুর্কি প্রজাতন্ত্র দ্রুত এমন কিছু আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ নেয়, যার মাধ্যমে তুরস্কে ওসমানীয় পরিবারের রাজনৈতিক ও আনুষ্ঠানিক অস্তিত্বের অবসান ঘটে।
এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ওসমানীয় পরিবারের সদস্যদের তুর্কি নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়, তাদের সম্পত্তি ও অর্থ রাষ্ট্রীয়ভাবে জব্দ করা হয়, এবং তুরস্কের ভূখণ্ডে বসবাস নিষিদ্ধ করে নির্বাসনে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এমনকি সিদ্ধান্তে এটাও অন্তর্ভুক্ত ছিল যে, ভবিষ্যতে পরিবারের কোনো সদস্যকে তুরস্কের মাটিতে দাফন করা যাবে না।
এই নির্বাসন আইন তৎকালীন তুরস্কের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। বিশেষ করে ধর্মনিরপেক্ষ ধারার ভেতরে কারা এই আইনের আওতায় পড়বে, তা নিয়ে তীব্র মতভেদ দেখা দেয়।
কিছু চরমপন্থী মহল দাবি তোলে, সিদ্ধান্তটি শুধু জীবিত সদস্যদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না রেখে অতীতে মৃত ওসমানীয় সুলতানদের দেহাবশেষও তুরস্কের বাইরে সরিয়ে নেওয়া হোক!
শেষ খলিফা ২য় আবদুল মজিদ তখন দোলমাবাহচে প্রাসাদে অবস্থান করছিলেন। প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি ‘মঁতেনের প্রবন্ধসমূহ’ পড়ছিলেন, ঠিক তখনই ইস্তাম্বুলের পুলিশপ্রধান আদনান বেগ সেখানে প্রবেশ করে তাঁকে জানান যে, ওসমানীয় পরিবারকে নির্বাসনে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং পরদিন ভোরের মধ্যেই শহর ছাড়তে হবে।
খবরটি শোনার পর পরিবার ও প্রাসাদের কর্মচারীদের মধ্যে শোক ও কান্নার পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
পরদিন ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে ২য় আবদুল মজিদ তাঁর পাঁচ সদস্যের পরিবার নিয়ে প্রাসাদ ত্যাগ করেন। তাদের পেছনে ছিল লাগেজ বোঝাই তিনটি গাড়ি। বহরটি বায়েজিদ মসজিদ ও গালাতা সেতু অতিক্রম করে দুপুর প্রায় এগারোটার দিকে চাতালজা রেলস্টেশনে পৌঁছায়।
বর্ণনাগুলোতে বলা হয়, দীর্ঘ যাত্রায় পরিবারের সদস্যরা ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত হয়ে পড়েছিলেন। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল ক্ষমতা ও মর্যাদা হারানোর গভীর শোক।
রাতের মধ্যভাগে ‘ইস্ট এক্সপ্রেস’ ট্রেন এসে পৌঁছায়। নির্বাসনে পাঠানোর জন্য ট্রেনের দুটি বগি বিশেষভাবে ওসমানীয় পরিবারের জন্য বরাদ্দ করা হয়। সেখান থেকেই শুরু হয় তাদের দীর্ঘ নির্বাসন যাত্রা।
রাষ্ট্রীয় জব্দের আওতায় আসে ওসমানীয় পরিবারের বিপুল সম্পদ। এর মধ্যে ছিল তোপকাপি প্রাসাদ, দোলমাবাহচে প্রাসাদ, ইয়িলদিজ প্রাসাদ এবং রাজকীয় গহনার সংগ্রহ। এই গহনাগুলোর মধ্যে তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় রুবি ও সবচেয়ে বড় পান্নার মতো দুর্লভ রত্নও ছিল।
ইস্ট এক্সপ্রেস ট্রেনটি চাতালজা থেকে ফ্রান্সের নিস শহরের দিকে যাত্রা করে। সেখান থেকে ওসমানীয় পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েন। তাদের কেউ যান ফ্রান্স, জার্মানি, ব্রিটেন, অস্ট্রিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রে। আবার কেউ আশ্রয় নেন সিরিয়া, মিসর ও লেবাননের মতো আরব দেশগুলোতে।
বিদেশে গিয়ে ওসমানীয় পরিবার চরম সংকটের মুখোমুখি হয়। তাদের কাছে ছিল না কোনো ব্যাংক হিসাব, পাসপোর্ট কিংবা কূটনৈতিক নথি। এই পরিস্থিতিতে অনেক সদস্য চরম দারিদ্র্যে জীবন কাটান। কেউ কেউ প্রতিবেশীদের সহায়তার ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হন। আবার কেউ কেউ রাজকীয় জীবন থেকে হঠাৎ দারিদ্র্যের বাস্তবতায় মানিয়ে নিতে না পেরে মারাত্মক মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হন।
এভাবেই ওসমানীয় পরিবার ধীরে ধীরে তুরস্কের রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে সম্পূর্ণভাবে বিদায় নিতে বাধ্য হয়।
দীর্ঘ কয়েক দশক পর পরিবারের সদস্যদের তুরস্কে ফেরার অনুমতি দেওয়া হয়। ১৯৫২ সালে, নির্বাসনের প্রায় ৩০ বছর পর, নারী সদস্যদের দেশে ফেরার সুযোগ দেওয়া হয়। পুরুষ সদস্যদের ক্ষেত্রে এই নিষেধাজ্ঞা ওঠে আরও দেরিতে, ১৯৭৪ সালে- প্রায় ৫০ বছর পর।
এই সিদ্ধান্তগুলোর মাধ্যমে রাজনৈতিক ও আইনি দিক থেকে ওসমানীয় খিলাফতের অধ্যায় চূড়ান্তভাবে বন্ধ হয়ে যায়। কয়েক শতাব্দী ধরে চলা এক শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটে, এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় ওসমানীয় পরিবারের ভূমিকা ইতিহাসের পাতায় স্থায়ীভাবে স্থান করে নেয়।

