
অনুসন্ধান প্রতিবেদন ,
নকশা অনুযায়ী কক্ষের দৈর্ঘ্য ৯০ ফুট এবং প্রস্থ ৪০ ফুট। ১৫ শতাংশ খাস জমির ওপর ইটের গাঁথুনি আর জরাজীর্ণ টিনের ছাউনি দেওয়া এমন ৪টি কক্ষ নিয়েই দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহ্যবাহী ‘যশোর রাইফেলস ক্লাব’। তবে ঐতিহ্য এখন কেবলই কাগজে-কলমে। বাস্তবে এটি এখন শহরের প্রাণকেন্দ্র গরিব শাহ্ সড়কে (রেজিস্ট্রি অফিসের উত্তর পাশে) এক পরিত্যক্ত ভুতুড়ে আস্তানা।
পাকিস্তান আমলে ১৯৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ক্লাবটির দীর্ঘ ৫৫ বছরেও মেলেনি কোনো স্থায়ী সমাধান,স্বাধীন বাংলাদেশ আমলে। বর্তমানে কোনো কার্যকরী কমিটি না থাকায় পুরোপুরি অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে ক্লাবটি। পরিত্যক্ত এই ভবনের বারান্দায় দিনে-রাতে চলে মাদক সেবন। গরিব শাহর মাজারে দূর-দূরান্ত থেকে আসা পুণ্যার্থীরা বাধ্য হয়ে এই বারান্দায় রাত যাপন করছেন। অন্যদিকে, ক্লাবের সামনের ও পেছনের মূল্যবান জমি জবরদখল করে গড়ে উঠেছে বেশ কিছু চায়ের দোকান।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ক্লাবটি ঠিক কাদের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছিল, তার সুনির্দিষ্ট কোনো দালিলিক প্রমাণ বা কাগজপত্র নেই। ক্লাবটির কোনো রেজিস্ট্রেশন বা নিবন্ধন নম্বর নেই। এমনকি জরাজীর্ণ দেওয়ালে নামমাত্র যে সাইনবোর্ডটি ঝুলছে, সেখানেও উল্লেখ নেই কোনো স্থাপন সাল।
বিস্ময়কর তথ্য হলো, নামের সাথে ‘রাইফেলস’ যুক্ত থাকলেও বর্তমান বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), যশোর জেলা পুলিশ, যশোর জেলা ক্রীড়া সংস্থা কিংবা জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের সাথে এই ক্লাবের অফিশিয়াল কোনো সম্পৃক্ততা নেই। ক্রীড়া মন্ত্রণালয়েরও কোনো অনুমোদন নেই এখানে। কেবল বাংলাদেশ শুটিং ফেডারেশনের ‘অ্যাফিলিয়েটেড’ (অনুমোদিত) শাখা হিসেবে এটি কোনোমতে টিকে আছে।
অনুসন্ধান ও স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এই ভবনে একসময় গণপূর্ত বিভাগের স্টাফরা বসবাস করতেন। পরবর্তীতে এটি ‘পুরাতন কসবা পুলিশ ফাঁড়ি’ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। ফাঁড়িটি স্থানান্তরের পর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসক কর্তৃক এই ১৫ শতাংশ (০.১৫ একর) খাস জমি রাইফেলস ক্লাবকে অস্থায়ী বন্দোবস্ত দেওয়া হয় (যার জেএল নং-৮০, দাগ নং-৬৫, মৌজা-যশোর)। বন্দোবস্তের পর কিছুদিন শুটিং প্রশিক্ষণ চললেও পরবর্তীতে জমি সংক্রান্ত মামলার জটিলতায় ক্লাবের সব কার্যক্রম পুরোপুরি মুখ থুবড়ে পড়ে।
দীর্ঘ ২২ বছর ধরে কার্যত কোনো নিয়মিত কমিটি নেই ক্লাবটিতে। ২০১১ সালের ৩ মার্চ ১৭ সদস্য বিশিষ্ট ৪ বছর মেয়াদি একটি কার্যকরী কমিটি গঠন করা হলেও তারা প্রশাসনিক কোনো সহযোগিতা পায়নি।
পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ৩০ মার্চ তৎকালীন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আবরাউল হাসান মজুমদার বার্ষিক সাধারণ সভার মাধ্যমে ক্লাবটিকে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেন এবং ২১ সদস্যের একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হয়। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর সেই ফাইল ধামাচাপা পড়ে যায়। বর্তমানে ক্লাবের কোনো বৈধ কমিটি বা অ্যাডহক কমিটি নেই। জেলা প্রশাসকের সাধারণ শাখার অফিস সহায়ক সঞ্জয় ও এনডিসি শাহীন সাহেবের কাছে ফাইল জমা থাকলেও কোনো অগ্রগতি হয়নি।
সাবেক সেক্রেটারি লিয়াকত আলীর ১২ বছর মেয়াদ কালে তিনি জানান “আমি ৪ বছর মেয়াদে টানা তিনবার দায়িত্ব পালন করেছি। কিন্তু প্রশাসনিকভাবে আমাদের কোনো সহযোগিতা করা হয়নি। ২০১১ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসক ক্লাবটি পুনরুজ্জীবিত করার জন্য তালিকা আহ্বান করেছিলেন। পরবর্তীতে ২০২৪ সালেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো সুফল পাওয়া যায়নি।”
বর্তমান সেক্রেটারি ফয়জুল কবির কচি জানান “আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তৎকালীন জেলা প্রশাসক আমাকে সেক্রেটারি করে ২১ সদস্যের একটি কার্যকরী কমিটি গঠন করেছিলেন। কিন্তু সেটা ছিল কেবল কাগজে-কলমে। কমিটির কোনো শপথ বা আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম আজ পর্যন্ত হয়নি। বর্তমান জেলা প্রশাসকের এই ক্লাবের বিষয়ে কোনো নজর নেই।”
সাবেক ও বর্তমান সেক্রেটারিরা জানান, এই ক্লাবের সদস্য হতে গেলে বাধ্যতামূলকভাবে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স থাকতে হয়। বর্তমানে ক্লাবের সদস্য সংখ্যা ২১২ জন, যাদের প্রত্যেকের অস্ত্রের লাইসেন্স রয়েছে। সাধারণ মানুষের এখানে সদস্য হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বর্তমানে কার্যকরী পরিষদের সহকারী সেক্রেটারি হাসান মিনু দুই বছর আগে মারা গেছেন। তবে সদস্য হিসেবে আছেন অ্যাডভোকেট হাসান ইমাম, ইয়াকুব কবির, জাহিদ হাসান টুকুন এবং এম এ মহিউদ্দিন লালু প্রমুখ। প্রটোকল অনুযায়ী জেলা প্রশাসক পদাধিকার বলে এই ক্লাবের সভাপতি।
দীর্ঘ ২০ থেকে ২৫ বছর ধরে জাতীয় পর্যায়ের শুটিং প্রতিযোগিতায় নিয়মিত অংশ নিলেও এই ক্লাবটি আজ পর্যন্ত কোনো পুরস্কার বা পদক অর্জন করতে পারেনি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়ে জানান, রাইফেলস ক্লাবের নামে বরাদ্দকৃত শুটিংয়ের জন্য ১৫,৫০০ (সাড়ে পনেরো হাজার) গুলি ও অনন্য সরঞ্জাম এর সঠিক হিসাব নেই।
৫৫ বছর পার হয়ে গেলেও কেন শহরের কেন্দ্রস্থলের এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটি আলোর মুখ দেখল না, তা নিয়ে ক্ষুব্ধ সাধারণ নাগরিকেরা। অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে, মাদকের আখড়া বন্ধ করে এবং দ্রুত একটি দক্ষ ও অরাজনৈতিক কমিটি গঠন করে যশোর রাইফেলস ক্লাবকে আধুনিক শুটিং একাডেমি হিসেবে গড়ে তোলার দাবি এখন সমগ্র যশোরবাসীর।

