
মোঃ তরিকুল ইসলাম খান :
মানুষের জীবন ক্ষণস্থায়ী। একদিন সবাই পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মুখ, চেহারা কিংবা ব্যক্তিগত পরিচয় অনেকটাই স্মৃতির আড়ালে চলে যায়। কিন্তু তার কাজ, চরিত্র, আদর্শ এবং সমাজে রেখে যাওয়া প্রভাব ইতিহাসে থেকে যেতে পারে বহুদিন।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহে দেখা গেছে, কিছু ব্যক্তি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, জনসমাবেশ কিংবা রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আবেগের কারণে কেউ কেউ দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তবে জনপ্রিয়তা এবং স্থায়ী সম্মান এক জিনিস নয়। জনপ্রিয়তা মুহূর্তের আবেগে তৈরি হতে পারে, কিন্তু সম্মান অর্জন করতে হয় দীর্ঘদিনের শালীন আচরণ, মানবিকতা এবং ইতিবাচক অবদানের মাধ্যমে।
সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত এক তরুণ বক্তাকে ঘিরেও নানা বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তাঁর হত্যাকাণ্ডের বিচার অবশ্যই আইন ও আদালতের বিষয়, এবং প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কোনো অবস্থাতেই বিচারবহির্ভূত সহিংসতা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
একই সঙ্গে এটিও সত্য যে, জনসমক্ষে ব্যবহৃত ভাষা ও আচরণ সমাজে গভীর প্রভাব ফেলে। কটূক্তি, অশালীন স্লোগান বা ব্যক্তিগত অবমাননাকর বক্তব্য সভ্য সমাজে ইতিবাচক সংস্কৃতি গড়ে তোলে না। ভাষা যখন শালীনতার সীমা অতিক্রম করে, তখন তা বিভাজন, বিদ্বেষ এবং উত্তেজনা বাড়াতে পারে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি দায়িত্বশীল ভাষা ব্যবহারও সমান প্রয়োজনীয়।
বাংলাদেশের ইতিহাসে যাঁরা স্থায়ী সম্মান পেয়েছেন, তাঁদের অধিকাংশই সাহিত্য, সংস্কৃতি, শিক্ষা, মুক্তিযুদ্ধ, বিজ্ঞান কিংবা মানবকল্যাণে অসাধারণ অবদান রেখে গেছেন। তাই কোনো ব্যক্তিকে মহান ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে তুলনা করার আগে তাঁর বাস্তব অবদান, কর্ম ও উত্তরাধিকার নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
সম্মান কখনো জোর করে আদায় করা যায় না। দাবি, স্লোগান বা আবেগের মাধ্যমে সাময়িক সমর্থন পাওয়া সম্ভব হলেও মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী স্থান করে নিতে প্রয়োজন আদব, বিনয়, সহনশীলতা এবং সমাজের জন্য ইতিবাচক অবদান। ইতিহাস শেষ পর্যন্ত ব্যক্তির কথার চেয়ে তার কাজকেই বেশি গুরুত্ব দেয়।
তাই ব্যক্তি নয়, আমাদের মূল্যায়নের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত তাঁর কর্ম, চরিত্র এবং সমাজে রেখে যাওয়া ইতিবাচক প্রভাব। মতভেদ থাকতেই পারে, কিন্তু শালীনতা, আইনের শাসন এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধই একটি সভ্য সমাজের ভিত্তি।

