
নিজস্ব প্রতিনিধি :
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, দেশে আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার বিষয়ে সরকার কোনো আপস করবে না।
তিনি আজ জাতীয় সংসদে বলেন, ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) আর্থিক শৃঙ্খলায় বিশ্বাস করে এবং কোনো অবস্থাতেই এতে আপস করবে না।’
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-এর শেয়ার তাদের কথিত প্রকৃত মালিকদের কাছে ফেরত দেওয়া এবং জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যদের ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনায় অযাচিত হস্তক্ষেপ বন্ধের দাবির প্রেক্ষিতে বিরোধী দলীয় সদস্যদের বক্তব্যের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
জাতীয় সংসদে বিধি ৬৮ অনুযায়ী বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ‘জনগুরুত্বপূর্ণ নোটিশ’ আকারে বিষয়টি উত্থাপন করেন।
আলোচনা শুরু করে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিএনপি যখনই ক্ষমতায় ছিল, তখনই সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সুশৃঙ্খল আর্থিক ব্যবস্থাপনা বজায় রেখেছে।
তিনি বলেন, ‘যখন আমরা সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ ও আর্থিক শৃঙ্খলার কথা বলি, তখন শুধু বলি না—আমরা তা বাস্তবায়ন করি।’
খসরু বলেন, অর্থনীতির প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং ব্যাংকিং খাতকে শক্তিশালী করার জন্য আর্থিক শৃঙ্খলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে যখন সরকার পূর্ববর্তী প্রশাসনের রেখে যাওয়া দুর্বল অর্থনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে।
ইসলামী ব্যাংকের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের বিষয়ে তিনি বলেন, ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিয়োগের কারণে বড় ধরনের আমানত উত্তোলনের কোনো নজির বিশ্বে নেই।
তিনি বলেন, ‘বিশ্বের কোথাও এমন নজির নেই, যেখানে চেয়ারম্যান নিয়োগের কারণে গ্রাহকেরা টাকা তুলে নেয়। গ্রাহকরা তাদের টাকার নিরাপত্তা এবং ব্যাংকের আস্থার বিষয়টি দেখে।’
খসরু অভিযোগ করেন, ব্যাংকটির চারপাশে বিক্ষোভ ও আন্দোলনের মাধ্যমে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে এবং কিছু গোষ্ঠী জনআস্থা নষ্ট করতে কাজ করছে।
তিনি বলেন, সরকার ব্যাংক খাত সুরক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং বাংলাদেশ ব্যাংক আইন অনুযায়ী স্বাধীনভাবে তার নিয়ন্ত্রক দায়িত্ব পালন করছে।
তিনি আরও বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যাংকের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা কাঠামোকে যথাযথ মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার কাজ করছে এবং সবাইকে এ প্রক্রিয়া নির্বিঘ্নে চলতে দেওয়ার আহ্বান জানান।
বিএনপির অর্থনৈতিক সাফল্যের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, অতীতের বিএনপি সরকার শক্তিশালী সামষ্টিক অর্থনৈতিক ভিত্তি বজায় রেখেছে।
তিনি বলেন, ‘স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে আর্থিক খাতের গুরুত্ব অপরিসীম। বিএনপি ছাড়া এই গুরুত্ব আর কেউ ভালো বোঝে না।’
তিনি সতর্ক করে বলেন, ব্যাংক খাতে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হলে তার প্রভাব পুরো অর্থনীতির ওপর পড়তে পারে।
তিনি বলেন, ‘আমরা একটি স্থিতিশীল বাংলাদেশ চাই। এর জন্য প্রয়োজন একটি শৃঙ্খলাপূর্ণ ও বিশ্বাসযোগ্য আর্থিক ব্যবস্থা।’
আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ইসলামী ব্যাংক সংক্রান্ত সব অভিযোগ গভীরভাবে তদন্ত করা উচিত।
তিনি জানান, নাবিল গ্রুপকে এলসির বিপরীতে ৭০০ কোটি টাকার ঋণ দেওয়া হয়েছিল, যার অর্থ পরে ব্যাংকে ফেরত আসেনি বলে অভিযোগ রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (সিএসআর) তহবিলের ব্যবহার, নিয়োগ প্রক্রিয়া, ঋণ বিতরণ ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
তিনি দাবি করেন, ব্যাংক অধিগ্রহণের পর প্রায় ৯ হাজার কর্মীকে যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়াই চাকরিচ্যুত করা হয়েছে এবং প্রায় ৬ হাজার নতুন কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, সব ধরনের অভিযোগ—ঋণ অনুমোদন, সিএসআর তহবিল ব্যবহার, নিয়োগ প্রক্রিয়া, নির্বাচনী অর্থায়ন ও অর্থপাচার তদন্ত হওয়া উচিত।
তিনি এস আলম গ্রুপসহ পূর্ববর্তী ও অন্তর্বর্তী প্রশাসনের সময়ের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও তদন্তের দাবি জানান।
নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি এবং ‘দোষ প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত তিনি নির্দোষ’ নীতির আওতায় তিনি দায়িত্ব পালনের অধিকার রাখেন।
নোটিশে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘স্বৈরাচারী শাসনামলের’ পতনের পর ইসলামী ব্যাংক ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল এবং গ্রাহকের আস্থা ফিরে পাচ্ছিল।
তিনি অভিযোগ করেন, নতুন করে বিতর্কিত ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দিয়ে ব্যাংকটি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে এবং এতে ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংক কোনো একটি রাজনৈতিক দলের নয়; এর গ্রাহক সব দল, ধর্ম ও শ্রেণির মানুষ।
তিনি ব্যাংকের শেয়ার পুনরায় প্রকৃত মালিকদের কাছে ফেরত দেওয়ার আহ্বান জানান এবং আইন অনুযায়ী বোর্ড পুনর্গঠনের দাবি করেন।
আলোচনায় বিরোধী দল ও সরকারি উভয়পক্ষই আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং ব্যাংক খাতে আস্থা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেন।
সূত্র : বাসস…

