
অর্থনীতি ডেস্ক :
আগামীকাল জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত হতে যাচ্ছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট। মূল্যস্ফীতির চাপ, বৈশ্বিক মন্দার শঙ্কা ও ডলার সংকটের মধ্যে এবারের বাজেট হতে যাচ্ছে সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট ও অর্থনীতির বর্তমান গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য আয়-ব্যয়ের একটি চিত্র তুলে ধরা হলো।
বাজেটের আকার ও প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্রে জানা গেছে, আগামী অর্থবছরের জন্য বাজেটের সম্ভাব্য আকার ধরা হতে পারে ৮ লাখ ১০ হাজার কোটি থেকে ৮ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। যা চলতি অর্থবছরের মূল বাজেট ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা থেকে প্রায় ৩-৪% বেশি।
জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হতে পারে ৬.৮%। আর মূল্যস্ফীতি ৬.৫% এ নামিয়ে আনার লক্ষ্য থাকছে। যদিও বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ৯% এর ঘরে ঘুরপাক খাচ্ছে।
সম্ভাব্য আয়ের খাতসমূহ
মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হতে পারে ৫ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে:
১. জাতীয় রাজস্ব বোর্ড নিয়ন্ত্রিত কর: ৫ লাখ কোটি টাকা
– আয়কর ও ভ্রমণ কর: ১ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা। করজাল বাড়ানো ও কর ফাঁকি রোধে ডিজিটাল পদ্ধতি জোরদার করা হবে।
– মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট): ২ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। ভ্যাটের আওতা বাড়ানো ও ইএফডি মেশিন ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ থাকবে।
– আমদানি শুল্ক: ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। বিলাসী পণ্য আমদানিতে শুল্ক বাড়তে পারে।
২. কর বহির্ভূত রাজস্ব: ৭০ হাজার কোটি টাকা
বিভিন্ন ফি, টোল, লভ্যাংশ ও জরিমানা থেকে এই আয় আসবে।
বাজেট ঘাটতি: সম্ভাব্য আয় ও ব্যয়ের হিসাবে ঘাটতি থাকতে পারে ২ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা থেকে ২ লাখ ৫৫ হাজার কোটি টাকা। যা জিডিপির ৪.৬%। এই ঘাটতি পূরণে সরকার ব্যাংক ঋণ, সঞ্চয়পত্র এবং বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানের ওপর নির্ভর করবে।
সম্ভাব্য ব্যয়ের খাতসমূহ
মোট ব্যয়ের মধ্যে পরিচালন ব্যয় ও উন্নয়ন ব্যয় দুটি অংশ থাকবে।
১. পরিচালন ব্যয়: ৫ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা
– সুদ পরিশোধ: ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সুদ বেড়ে যাওয়ায় এই খাতে ব্যয় সবচেয়ে বেশি বাড়ছে।
– বেতন-ভাতা: ৯০ হাজার কোটি টাকা। নতুন পে-স্কেল না হলেও বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট ও নিয়োগের কারণে ব্যয় বাড়বে।
– ভর্তুকি ও প্রণোদনা: ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। বিদ্যুৎ, জ্বালানি, সার ও খাদ্যে ভর্তুকি অব্যাহত থাকবে। তবে অপচয় কমাতে টার্গেটেড ভর্তুকির কথা বলা হতে পারে।
– সামাজিক নিরাপত্তা: ১ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা। বয়স্ক, বিধবা ভাতা ও টিসিবির কার্যক্রমে বরাদ্দ বাড়তে পারে।
২. উন্নয়ন ব্যয়: ৩ লাখ কোটি টাকা
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) তে বরাদ্দ থাকতে পারে ২ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। অগ্রাধিকার পাবে:
– যোগাযোগ অবকাঠামো: মেট্রোরেল সম্প্রসারণ, ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে, রেল সংযোগ।
– বিদ্যুৎ ও জ্বালানি: নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও গ্যাস অনুসন্ধানে গুরুত্ব।
– শিক্ষা ও স্বাস্থ্য: নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়ন ও কমিউনিটি ক্লিনিক শক্তিশালীকরণ।
– কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়ন: স্মার্ট কৃষি, সেচ ও কৃষি যান্ত্রিকীকরণে বরাদ্দ বাড়বে।
– মানবসম্পদ: ফ্রিল্যান্সিং ও আইটি খাতে প্রশিক্ষণে বিশেষ বরাদ্দ আসতে পারে।
এবারের বাজেটের চ্যালেঞ্জ
১. মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ: ডলারের দাম বৃদ্ধি ও আমদানি ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে।
২. রাজস্ব আদায়: জিডিপির তুলনায় কর-জিডিপি অনুপাত এখনও ৮% এর নিচে। করের আওতা না বাড়ালে ঘাটতি মেটানো কঠিন হবে।
৩. বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ: রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানো না গেলে রিজার্ভের ওপর চাপ থাকবে।
৪. কর্মসংস্থান: প্রতি বছর ২০ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে আসছে। তাদের জন্য মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরি বড় চ্যালেঞ্জ।
সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা
১. নিত্যপণ্যের দাম কমাতে ভ্যাট-ট্যাক্স হ্রাস।
২. শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি ও সেবার মান উন্নয়ন।
৩. তরুণদের জন্য উদ্যোক্তা ঋণ সহজীকরণ ও কর রেয়াত।
৪. কৃষকদের জন্য সার, বীজ ও ডিজেলে ভর্তুকি অব্যাহত রাখা।
৫. সঞ্চয়পত্রের সুদহার না কমানো।
শেষ কথা
এবারের বাজেটকে হতে হবে ‘সংকোচনমূলক কিন্তু জনবান্ধব’। অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প বাদ দিয়ে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ, অপচয় রোধ ও দুর্নীতি কমিয়ে সুশাসন নিশ্চিত করাই হবে বাজেট বাস্তবায়নের মূল মন্ত্র। দিনশেষে বাজেটের সাফল্য নির্ভর করবে এটি সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা স্বস্তি আনতে পারে তার ওপর। কারণ বাজেট শুধু সংখ্যার হিসাব নয়, এটি কোটি মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার দলিল।

