
মোঃ জাহিদ হোসেন জিমু-গাইবান্ধা
ঈদের আনন্দ তখনও পুরোপুরি ফুরিয়ে যায়নি। গ্রামের বাতাসে তখনও লেগে আছে উৎসবের রেশ। আর সেই আনন্দকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলতে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার মনিরাম পাটোয়ারীপাড়া কৃষি কলেজ মাঠে বসেছিল এক ব্যতিক্রমী মিলনমেলা। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত হাসি, উল্লাস, খেলাধুলা, করতালি আর মানুষের ঢলে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।

শনিবার (৩০ মে) মনিরাম শান্তিরক্ষা যুব এন্ড ক্রীড়া উন্নয়ন ক্লাবের উদ্যোগে আয়োজিত ঈদ পুনর্মিলনী, আজীবন সদস্য সম্মাননা, গুণীজন সংবর্ধনা, গ্রামীণ খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ঘিরে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। দিনব্যাপী এ আয়োজনে অংশ নেন বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর, তরুণ ও প্রবীণরা।

সকাল গড়ানোর আগেই আশপাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে মানুষ মাঠে জড়ো হতে শুরু করেন। কেউ মোটরসাইকেলে, কেউ অটোরিকশায়, আবার কেউ পরিবার নিয়ে হেঁটেই চলে আসেন অনুষ্ঠানে। দুপুরের আগেই মাঠজুড়ে নেমে আসে মানুষের ঢল। মাঠের চারপাশে বসে ছোট ছোট দোকান। কোথাও চটপটি, কোথাও ঝালমুড়ি, কোথাও আখের রস কিংবা ভাজাপোড়ার দোকানে ছিল উপচেপড়া ভিড়। শিশুদের হাতে রঙিন বেলুন, তরুণদের হাতে মোবাইল ফোন আর প্রবীণদের মুখে পুরনো দিনের গল্প মিলিয়ে পুরো পরিবেশ যেন হয়ে ওঠে গ্রামবাংলার চিরচেনা উৎসবের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
কোরআন তেলাওয়াত ও অতিথিদের আগমনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। এরপর শুরু হয় গ্রামীণ খেলাধুলা। প্রথমেই হাঁস খেলা। প্রতিযোগীরা দৌড়ে হাঁস ধরার চেষ্টা করছেন, আর পিচ্ছিল হাঁস বারবার ফসকে যাচ্ছে হাত থেকে। সেই দৃশ্য দেখে মাঠজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে হাসির রোল। এরপর চোখ বেঁধে হাঁড়ি ভাঙা খেলায় অংশ নেন তরুণরা। একেকজনের লাঠি গিয়ে পড়ছে ভিন্নদিকে, আর দর্শকরা চিৎকার-করতালিতে উৎসাহ দিচ্ছেন প্রতিযোগীদের।
মোরগ লড়াই, হাডুডু ও বিভিন্ন দলীয় খেলায় বাড়তে থাকে উত্তেজনা। দুই দলের সমর্থকদের চিৎকারে সরগরম হয়ে ওঠে মাঠ। শিশুদের জন্য ছিল বুদ্ধিপরিচয় প্রতিযোগিতা ও নানা বিনোদনমূলক আয়োজন। নারীদের জন্য আয়োজন করা হয় বালিশ খেলা ও মিউজিক্যাল চেয়ার প্রতিযোগিতা। প্রথমে কিছুটা সংকোচ থাকলেও পরে হাসি-আনন্দে অংশ নেন নারীরাও। তাদের উচ্ছ্বাসে আরও প্রাণ ফিরে পায় পুরো অনুষ্ঠান।
বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে ৬০ বছরের বেশি বয়সী প্রবীণদের জন্য রাখা হয় নিশ্চিত পুরস্কারভিত্তিক কুইজ প্রতিযোগিতা। সাদা চুলের প্রবীণরা যখন মঞ্চে দাঁড়িয়ে উত্তর দিচ্ছিলেন, তখন দর্শকদের চোখে-মুখে ফুটে ওঠে এক অন্যরকম আবেগ। অনেকে বলেন, এমন আয়োজন এখন গ্রামাঞ্চলে খুব কমই দেখা যায়।
দ্বিতীয় অধিবেশনে অনুষ্ঠিত হয় আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল সমর্থকদের প্রীতি ফুটবল ম্যাচ। খেলা ঘিরে মাঠজুড়ে তৈরি হয় ছোটখাটো স্টেডিয়ামের আবহ। স্লোগান, হাসি-ঠাট্টা, খুনসুটি আর উচ্ছ্বাসে মাতোয়ারা হয়ে ওঠেন দর্শকরাও। খেলা শেষে দুই দলের খেলোয়াড়দের কোলাকুলিতে ফুটে ওঠে সম্প্রীতির চিত্র।
বিকেলে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভা ও গুণীজন সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মনিরাম শান্তিরক্ষা যুব এন্ড ক্রীড়া উন্নয়ন ক্লাবের সভাপতি মো. মাসুদ পারভেজ পাটোয়ারী।
আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ক্লাবের প্রাক্তন সভাপতি ও বামনডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আব্দুল জব্বার এবং সাবেক চেয়ারম্যান ও শিক্ষক মো. নজমুল হুদা।
বক্তারা বলেন, ঈদ শুধু আনন্দের উৎসব নয়, এটি মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ, সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সৌহার্দ্য গড়ে তোলে। বর্তমান সময়ে তরুণদের খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত রাখা খুবই জরুরি। এমন আয়োজন সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
চেয়ারম্যান মো. আব্দুল জব্বার বলেন, ‘গ্রামের মানুষ এখন আগের মতো একত্রিত হয় না। এই ধরনের আয়োজন মানুষকে আবার কাছাকাছি নিয়ে আসে। তরুণদের সুস্থ বিনোদন ও সামাজিক সম্প্রীতির জন্য এমন উদ্যোগ খুব প্রয়োজন।’
সাবেক চেয়ারম্যান নজমুল হুদা বলেন, ‘গ্রামীণ খেলাধুলা আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। নতুন প্রজন্মকে এসবের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে না পারলে একসময় এগুলো শুধু গল্প হয়েই থাকবে।’
আয়োজক কমিটির সদস্য মিশু পারভেজ পাটোয়ারী বলেন, ‘আমরা চেয়েছি ঈদের আনন্দটা সবাই একসঙ্গে ভাগাভাগি করুক। শুধু খেলাধুলা নয়, গ্রামের মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য ও বন্ধন তৈরি করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। হারিয়ে যেতে বসা গ্রামীণ সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতেই এই আয়োজন করা হয়েছে।’
স্থানীয় বাসিন্দা জিয়াউর রহমান বলেন, ‘অনেক বছর পর গ্রামের মাঠে এমন আয়োজন দেখলাম। সকাল থেইকা মানুষ আসছে, কেউ ফিরতে চায় না। মনে হইতেছে ছোটবেলার সেই দিনগুলা আবার ফিরে আসছে।’
গৃহিণী মুন্নি বেগম বলেন, ‘বাচ্চাদের নিয়ে সকালেই আসছি। এত খেলা, এত মানুষ, এত আনন্দ। মেয়েদের জন্যও আলাদা খেলার ব্যবস্থা থাকায় আমরা অনেক আনন্দ করছি।’
সন্ধ্যা নামতেই শুরু হয় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। একের পর এক গান, কবিতা ও পরিবেশনায় মুগ্ধ হয়ে যান দর্শকরা। মোবাইলের আলো, করতালি আর উচ্ছ্বাসে পুরো মাঠ যেন আলোকিত হয়ে ওঠে। শেষে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়।
রাত বাড়লেও মানুষের ভিড় কমছিল না। কেউ গল্পে মগ্ন, কেউ ছবি তুলতে ব্যস্ত, আবার কেউ শেষ মুহূর্তটুকুও স্মৃতিতে ধরে রাখতে চাইছিলেন। ঈদের তৃতীয় দিনের এই আয়োজন তাই শুধু একটি অনুষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এটি হয়ে উঠেছিল গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য, আনন্দ আর মানুষের মিলনের এক প্রাণবন্ত উদযাপন।

