
সাধন সাহা জয়-ব্রাহ্মণবাড়িয়া
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল (সদর) হাসপাতালে মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে। কোনো স্বজন ছাড়াই সম্পূর্ণ অসহায় ও ভবঘুরে এক তরুণী মাহমুদা আক্তার রূপার (২০) পাশে দাঁড়িয়ে গভীর রাতে জরুরি সফল সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে একটি ফুটফুটে পুত্রসন্তান প্রসব করিয়েছেন হাসপাতালের চিকিৎসকেরা। বর্তমানে মা ও নবজাতক দু’জনেই সুস্থ আছেন (যার ছবি ওপরের সংযুক্ত ফ্রেমে রয়েছে)।
গত শুক্রবার (২২ মে) ভোররাত আনুমানিক ৩টার দিকে হাসপাতালের গাইনি বিভাগে এই জরুরি সিজারিয়ান অপারেশন সম্পন্ন হয়।
হাসপাতাল ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কুমিল্লার বড়ুড়া উপজেলার বাসিন্দা রূপা ছোটবেলা থেকেই রেলের আশ্রয়ে বড় হওয়া এক অসহায় মেয়ে। তিনি দীর্ঘ দিন যাবৎ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া রেলস্টেশন এলাকায় ভবঘুরে জীবনযাপন করতেন। সেখানেই স্টেশনে কর্মরত সাব্বির মিয়া নামের এক যুবকের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এক পর্যায়ে বিয়ের আশ্বাস দিয়ে রূপার সাথে দীর্ঘদিন শারীরিক সম্পর্ক বজায় রাখার অভিযোগ ওঠে ওই যুবকের বিরুদ্ধে। পরবর্তীতে রূপা অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লে সাব্বির তাঁর পিতৃত্বের স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করে সুকৌশলে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়।
প্রসব ব্যথা শুরু হলে গত বৃহস্পতিবার (২১ মে) রাত ৮টার দিকে এক প্রতিবেশীর সহায়তায় রূপাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে এনে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালে আসার পর রূপার সাথে কোনো আত্মীয়-স্বজন না থাকায় সম্পূর্ণ মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁর দায়িত্ব নেন হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সরা। প্রথমে নরমাল ডেলিভারির চেষ্টা করা হলেও পরবর্তীতে রূপার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকলে গভীর রাতে জরুরি ভিত্তিতে সিজারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
হাসপাতালের গাইনি কনসালটেন্ট ডা. কামরুন্নাহার বেগম এবং অ্যানেসথেসিয়া বিশেষজ্ঞ ডা. হাবিবুর রহমান শামীম-এর যৌথ প্রচেষ্টায় ভোররাতে সফলভাবে অপারেশনটি সম্পন্ন হয়। গাইনি বিভাগের ইনচার্জ মোছা. মর্জিনা বেগম জানান, কোনো স্বজন না থাকলেও হাসপাতালের নার্স ও আয়াদের আন্তরিকতায় রূপাকে সর্বোচ্চ মাতৃস্নেহে সেবা দেওয়া হয়েছে।
অসহায় মায়ের সন্তান প্রসবের খবর পেয়ে হাসপাতালে ছুটে আসেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অন্যতম সামাজিক মানবিক সংগঠন ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর’-এর স্বেচ্ছাসেবীরা। তারা সদ্যজাত শিশুটির জন্য নতুন পোশাক, ডায়াপার, দুধ ও উন্নত পুষ্টিকর খাবারসহ প্রয়োজনীয় সমস্ত ওষুধপত্রের দায়িত্ব নেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. আজহার উদ্দিন বলেন,
”মা ও শিশু দু’জনেই এখন আশঙ্কামুক্ত ও সুস্থ আছেন। রূপার পাশে কেউ না থাকলেও আমাদের বাতিঘর পরিবার তাঁর পাশে আছে। মা ও নবজাতকের সুস্থতার জন্য ভবিষ্যতেও আমাদের এই মানবিক সহায়তা ও চিকিৎসাসেবা অব্যাহত থাকবে।”
ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২৫০ শয্যা সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. রতন কুমার ঢালি বলেন,
”মেডিকেল টিম অত্যন্ত মানবিক বিবেচনায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ায় সময়মতো মা ও নবজাতক উভয়ের জীবন রক্ষা পেয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তাঁদের প্রয়োজনীয় সকল বিনামূল্যে চিকিৎসা সহায়তা ও ওষুধ প্রদান অব্যাহত থাকবে।”
এদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শাহিনুল ইসলাম জানান, ফুটফুটে শিশু ও তাঁর মায়ের সার্বিক বিষয় ও নিরাপত্তার বিষয়টি পুলিশ প্রশাসন ও স্থানীয় বাতিঘর সংগঠনের যৌথ তত্ত্বাবধানে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

