
কবির হোসেন রাকিব, (লক্ষ্মীপুর)
যে বাবা নিজের রক্ত জল করে, অক্লান্ত পরিশ্রমে সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখালেন, পরম স্নেহে আগলে রেখে বড় করলেন—সেই সন্তানের হাত কীভাবে ওঠে জন্মদাতার গায়ে? পৃথিবী আজ কোন অতলে তলিয়ে যাচ্ছে? কলিযুগের চরম বর্বরতা ও নৃশংসতার এক অবর্ণনীয় ঘটনা ঘটেছে লক্ষ্মীপুরের রামগতিতে। পৈতৃক সম্পত্তির লোভে জন্মদাতা পিতাকে অমানুষিক নির্যাতন করে হাত-পা ভেঙে ঘরের ভেতর তালাবদ্ধ করে রাখার এক পৈশাচিক ঘটনা উন্মোচিত হয়েছে। পাষণ্ড দুই ছেলে ও স্ত্রীর নির্মম পিটুনিতে মুমূর্ষু অবস্থায় ছটফট করা ওই পিতাকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করেছে পুলিশ।
আজব এই নিষ্ঠুরতার ঘটনাটি ঘটেছে রামগতি উপজেলার ২ নং চরবাদাম ইউনিয়নের ২ নং ওয়ার্ডে। নির্যাতনের শিকার সেই দুর্ভাগ্যবান পিতার নাম মিলন মিয়া।
সম্পত্তির লোভ বনাম রক্তের সম্পর্ক
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের মাধ্যমে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরেই পৈতৃক সম্পত্তি নিজের নামে লিখে নেওয়ার জন্য মিলন মিয়ার ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে আসছিল তার আপন দুই ছেলে ও স্ত্রী। রক্তের সম্পর্ককে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে, লোভের বশবর্তী হয়ে গত কয়েকদিন আগে বড় ছেলে সোহাগ, ছোট ছেলে রিয়াজ এবং স্ত্রী পান্না আক্তার মিলে মিলন মিয়ার ওপর লাঠিসোটা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ঘাতকের মতো তারা মিলন মিয়াকে পিটিয়ে তার হাত ও পা ভেঙে দেয়।
অপরাধ ঢাকতে ‘পরকীয়া’র কাল্পনিক নাটক
শুধু হাত-পা ভেঙেই ক্ষান্ত হয়নি এই পাষণ্ডরা। এই পাশবিক ও ন্যাক্কারজনক ঘটনা ধামাচাপা দিতে এবং প্রতিবেশীদের চোখ ফাঁকি দিতে রক্তাক্ত ও যন্ত্রণায় কাতর মিলন মিয়াকে ঘরের একটি অন্ধকার কক্ষে তালাবদ্ধ করে বন্দি করে রাখা হয়। জঘন্যতম বিষয় হলো, নিজেদের অপরাধ ঢাকতে ও গ্রামবাসীকে বিভ্রান্ত করতে ওই বৃদ্ধ পিতার বিরুদ্ধে ‘পরকীয়া’র এক মিথ্যা ও কাল্পনিক অপবাদ ছড়ায় অভিযুক্তরা।
সাংবাদিকদের দেখে বৃদ্ধ পিতার কান্নার রোল: “বাবা, তোমরা আমাকে বাঁচাও!”
টাকা আর সম্পত্তির মোহে অন্ধ হয়ে যাওয়া সমাজ যখন নিশ্চুপ, তখন গোপন সূত্রে খবর পেয়ে স্থানীয় কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মী মানবিক টানে চরবাদাম ইউনিয়নের ওই বাড়িতে সরাসরি সরেজমিনে অনুসন্ধানে যান। সেখানে গিয়ে তারা দেখতে পান এক লোমহর্ষক দৃশ্য—একটি রুদ্ধদ্বার কক্ষে তালাবন্দি অবস্থায় তীব্র যন্ত্রণায় গোঙাচ্ছেন গুরুতর আহত মিলন মিয়া।
এ সময় সাংবাদিকদের দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন ভুক্তভোগী সেই বৃদ্ধ। অশ্রুসিক্ত চোখে দুহাত জোড় করে আকুতি জানিয়ে তিনি বলতে থাকেন,
”বাবা, তোমরা আমাকে বাঁচাও! ওরা সম্পত্তির জন্য আমাকে মেরেই ফেলবে, আমাকে এখান থেকে উদ্ধার করো।”
একজন পিতার মুখ থেকে এমন আর্তনাদ উপস্থিত সাংবাদিকদেরও স্তব্ধ করে দেয়।
ওসির তৎপরতা ও উদ্ধার অভিযান
সাংবাদিকরা তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি রামগতি থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) লিটন দেওয়ানকে অবহিত করলে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দ্রুত সেখানে একদল পুলিশ পাঠান। পুলিশ সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে ঘরের তালা ভেঙে মুমূর্ষু অবস্থায় মিলন মিয়াকে উদ্ধার করেন। তাকে চিকিৎসার জন্য দ্রুত রামগতি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে (জনস্বাস্থ্য হাসপাতাল) ভর্তি করানো হয়। বর্তমানে তিনি সেখানে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
কঠোর আইনি ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে রামগতি থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) লিটন দেওয়ান তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
”খবর পাওয়া মাত্রই আমরা ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠিয়ে ভুক্তভোগী পিতাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তির ব্যবস্থা করেছি। যে সন্তানকে পিতা পৃথিবীর আলো দেখিয়েছে, সেই জন্মদাতার ওপর এমন ন্যাক্কারজনক ও বর্বর নির্যাতন কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। এই ঘটনায় জড়িত দুই ছেলে ও স্ত্রীসহ সকল অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।”
প্রতিবেদকের মন্তব্য:
টাকা-পয়সা আর সম্পত্তির লোভ মানুষের বিবেককে কতটা অন্ধ করে দিতে পারে, রামগতির এই ঘটনাই তার জ্বলন্ত প্রমাণ। যে সন্তানের মুখে একটু হাসি ফোটাতে পিতা নিজের জীবন যৌবন বিলিয়ে দেন, সেই সন্তান যখন সম্পত্তির জন্য পিতার হাত-পা ভেঙে দেয়, তখন প্রশ্ন জাগে—আমরা আসলে কোন সমাজে বাস করছি? মানবিক মূল্যবোধের এই চরম অবক্ষয় রুখতে পাষণ্ড সন্তানদের এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত, যেন আর কোনো পিতাকে এভাবে বন্ধ ঘরে অশ্রু ফেলতে না হয়।

