
নিজস্ব প্রতিবেদক :
ইতিহাসের সর্ববৃহৎ জানাজার সাক্ষী হলো রাজধানী ঢাকা। গতকাল পুরো মহানগরী যেন পরিণত হয়েছিল এক বিশাল জানাজার মাঠে। বিএনপি চেয়ারপারসন ও তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শেষ বিদায়ে সকাল থেকেই রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ অভিমুখে নামে মানুষের ঢল। অনেকের মতে, এটি মুসলিম বিশ্বের স্মরণকালের অন্যতম বৃহৎ জানাজা।
দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে লাখো মানুষ এই জানাজায় অংশ নেন। জাতীয় সংসদ ভবনের সব মাঠ, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ এবং সংসদ ভবনের চারপাশের প্রতিটি সড়ক হয়ে ওঠে জনসমুদ্রে পরিণত। কফিন থেকে চতুর্দিকে দুই থেকে তিন কিলোমিটার ছাড়িয়ে যায় জানাজার কাতার। যারা সময়মতো উপস্থিত হতে পারেননি, তারা টেলিভিশনের সরাসরি সম্প্রচারের সঙ্গে নিজ নিজ অবস্থান থেকে জানাজায় শরিক হন।
এই জানাজা শুধু মানুষের সংখ্যার দিক থেকেই নয়, আবেগ, ভালোবাসা ও অশ্রু দিয়েও অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে বলে মনে করছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। প্রতিটি মুখে ছিল হারানোর বেদনা। রাজনীতির বাইরে থাকা বহু মানুষ এসেছিলেন কেবল একজন নারীর সংগ্রাম, সাহস ও দৃঢ়তার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে। নারীদের জন্যও আলাদা করে জানাজা পড়ার ব্যবস্থা করা হয়। জানাজা ও দাফন শেষে সন্ধ্যা পর্যন্ত এলাকাজুড়ে মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
জানাজাকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের দিকে মানুষের স্রোত নামতে শুরু করে। বাংলামোটর, কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, নিউমার্কেট, মিরপুর, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া হয়ে খামারবাড়ি ও বিজয় সরণি—সব সড়কেই দেখা যায় শুধু মানুষ আর মানুষ। অলিগলিতেও দাঁড়িয়ে অসংখ্য মানুষ জানাজায় অংশ নেন। কোথাও গাড়ি চলার জায়গা ছিল না, এমনকি পা ফেলার স্থানটুকুও পাওয়া যায়নি।
দুপুর ২টায় জানাজা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও বেলা ১১টার মধ্যেই মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ও সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা পুরোপুরি লোকারণ্য হয়ে পড়ে। মাইকে ঘোষণা দিয়ে সংসদ ভবনের পূর্ব ও পশ্চিম পাশের মাঠে অবস্থান নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানানো হয়। খামারবাড়ি মোড় থেকে সংসদের গেট পর্যন্ত পৌঁছাতে ভিড় ঠেলে আধা ঘণ্টার বেশি সময় লেগে যায়।
দূরদূরান্ত থেকে আসা মানুষ দুই থেকে তিন কিলোমিটার আগে গাড়ি রেখে হেঁটে জানাজাস্থলের দিকে আসেন। শিশু থেকে বৃদ্ধ—সব বয়সের মানুষ, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হাঁটছিলেন। কেউ হাতে জাতীয় পতাকা, কেউ দলীয় পতাকা, আবার কেউ নিঃশব্দে চোখের পানি মুছতে মুছতে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। ৮ থেকে ১০ কিলোমিটার হেঁটেও অনেকে জানাজায় উপস্থিত হন।
রাজধানীর মেট্রোরেলেও ছিল অস্বাভাবিক ভিড়। মানুষের একটাই গন্তব্য—শেষবারের মতো ‘আপন নেত্রীকে’ বিদায় জানানো। ভিড়ের কারণে অনেক যাত্রী নির্ধারিত স্টেশনে নামতে পারেননি। মানিক নামের এক ব্যক্তি জানান, সচিবালয় স্টেশন থেকে উঠে ফার্মগেট স্টেশনে নামতে চাইলেও ভিড়ের কারণে বিজয় সরণি পেরিয়ে আগারগাঁও স্টেশনে নামতে হয়। সড়কের পাশাপাশি মেট্রোস্টেশনগুলোতেও দাঁড়িয়ে হাজার হাজার মানুষ জানাজায় অংশ নেন।
বিকাল ৩টায় মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় ইমামতি করেন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি মুহাম্মদ আবদুল মালেক। দোয়ার সময় লাখ লাখ মানুষের নিস্তব্ধতা যেন এক গভীর শোকগাথায় পরিণত হয়।
জানাজার আগে বেগম খালেদা জিয়ার জন্য সবার কাছে দোয়া চান তাঁর বড় ছেলে ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তাঁর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। জানাজায় উপস্থিত ছিলেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসসহ সরকারের বিভিন্ন উপদেষ্টা, ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী, কূটনৈতিক প্রতিনিধি এবং বেগম খালেদা জিয়ার পরিবার-পরিজন। জানাজা শেষে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস শোকাহত তারেক রহমানকে সান্ত্বনা জানান।
জানাজায় অংশ নিতে এসে বহু মানুষ কান্নায় ভেঙে পড়েন। কেউ বলছিলেন, ‘তিনি আমাদের শেষ ভরসা ছিলেন।’ ভিড়ের চাপে একজনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে এবং সংসদ এলাকার প্রাচীর ডিঙিয়ে প্রবেশের চেষ্টা করতে গিয়ে কয়েকজন আহত হন। তবু শোকাহত মানুষের স্রোত থামেনি।
জানাজায় উপস্থিত ছিলেন দৈনিক জনজাগরণ পত্রিকার সম্পাদক মো. শিহাব উদ্দিন, দৈনিক সত্যের সন্ধান ও ডিএস টিভি নিউজের সম্পাদক সাইমন এবং তাঁর সঙ্গে আব্দুল গফফার।
কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউয়ের দুই পাশে, ফুটওভারব্রিজে, এমনকি ভবনের ছাদেও মানুষ দাঁড়িয়ে জানাজায় অংশ নেন। ঢাকা শহর যেন পরিণত হয় এক নীরব শোকযাত্রার নগরীতে। কেউ স্লোগান দেয়নি, কেউ নির্দেশনা দেয়নি—তবু এক অদৃশ্য শৃঙ্খলায় সবাই এগিয়ে গেছে একই দিকে।
জানাজায় অংশ নেওয়া সবাই বিএনপির নেতা-কর্মী ছিলেন না। ছিলেন সাধারণ পেশাজীবীরাও। বেসরকারি চাকরিজীবী আমিরুল ইসলাম বলেন, “আমি রাজনীতি করি না। কিন্তু একজন নারী দেশের মানুষের জন্য জীবনে এত নির্যাতন সহ্য করেছেন—তাঁর জানাজায় কয়েক কিলোমিটার হাঁটতে আমার কষ্ট হয়নি।”
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, সংসদ ভবনের চারপাশ ঘিরে প্রায় ১৫–১৬ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে মানুষের সমাগম ঘটে—যা ঢাকার ইতিহাসে নজিরবিহীন। ত্রিশ বছরের সাংবাদিকতা জীবনে এমন জনসমাবেশ দেখেননি বলেও জানান অনেকে।
বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা কেবল একজন রাজনৈতিক নেত্রীর বিদায় নয়, ছিল একটি যুগের সমাপ্তি। লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করে—সময় বদলালেও মানুষের ভালোবাসা ও স্মৃতির জায়গা থেকে তাঁকে মুছে ফেলা যাবে না। ইতিহাসের পাতায় এই জানাজা লেখা থাকবে অশ্রু দিয়ে, লেখা থাকবে ঢাকাজুড়ে এক দিনের জন্য থেমে যাওয়া জীবনের নিঃশব্দ সাক্ষ্য হয়ে।

