
নিজস্ব প্রতিনিধি :
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু বিদায় কেবল ব্যক্তিগত শোকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এগুলো জাতির স্মৃতি, রাষ্ট্রের আচরণ ও ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য এক ধরনের পরীক্ষাও হয়ে ওঠে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যু এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর দাফন ঠিক এমনই একটি মুহূর্ত। এই বিদায়ের মধ্য দিয়ে একটি দীর্ঘ, জটিল ও বিতর্কিত রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে- যার অভিঘাত কেবল রাজনীতির সীমায় নয়, রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতি ও গণতান্ত্রিক চর্চার প্রশ্নেও প্রতিফলিত হয়েছে।
খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং তিনবারের সরকারপ্রধান হিসেবে ইতিহাসে নিজস্ব স্থান অর্জন করেছেন। স্বাধীনতার পরবর্তী রাষ্ট্র কাঠামোর ভেতরে তাঁর রাজনৈতিক উত্থান যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তাঁর সময়কাল ছিল তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণ, আন্দোলন-সংঘাত ও পারস্পরিক অবিশ্বাসে পরিপূর্ণ। এককালে দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে তাঁর অবস্থান নির্ধারক ছিল। রাষ্ট্রীয় মর্যাদা, জাতীয় পতাকায় মোড়া কফিন এবং তিন বাহিনীর আনুষ্ঠানিক উপস্থিতি প্রমাণ করে যে সময়ের দূরত্ব শেষে রাষ্ট্র ইতিহাসকে একটি নির্দিষ্ট উচ্চতায় দাঁড় করিয়ে দেখার চেষ্টা করেছে।
জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় জানাজা আয়োজন নিছক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়। সংসদ ভবন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রের প্রতীক। এই প্রাঙ্গণে জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়া মানে খালেদা জিয়াকে কেবল বিরোধী রাজনৈতিক নেতা হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করা একজন সরকারপ্রধান হিসেবেই স্বীকৃতি দেওয়া। রাজনৈতিক মতাদর্শের পার্থক্য সত্ত্বেও এই স্বীকৃতি একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। এটি দেখিয়েছে যে রাষ্ট্র রাজনৈতিক মতভেদের সীমারেখা অতিক্রম করে অন্তত মৃত্যুর মুহূর্তে হলেও ন্যূনতম সম্মান প্রদর্শন করতে পারে।
জিয়া উদ্যানে, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সমাধির পাশে তাঁর দাফন এক অর্থে ইতিহাসের বৃত্ত সম্পূর্ণ করেছে। সামরিক শাসনের পর যে রাজনৈতিক ধারায় বেসামরিক রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেই ধারার দুই প্রধান মুখ- জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়া; এবার একই প্রাঙ্গণে চিরনিদ্রায় শায়িত। এটি কেবল পারিবারিক নয়, রাজনৈতিক ইতিহাসেরও প্রতীকী সমাপ্তি। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যেসব সংঘাত, অভিযোগ ও প্রতিহিংসার উদাহরণ পাওয়া যায়, সেখানে এই চিহ্নিত সমাপ্তি একটি বিরল দৃশ্য।
খালেদা জিয়ার জানাজায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এবং তিন বাহিনীর প্রধানদের উপস্থিতি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রাজনীতি যেখানে শূন্য-সমষ্টির খেলায় পরিণত হয়েছিল, এক পক্ষের স্বীকৃতি মানেই অন্য পক্ষের অস্বীকার- সেখানে এই উপস্থিতি দেখিয়েছে যে রাষ্ট্র চাইলে অন্তত মৃত্যুর মুহূর্তে সংকীর্ণতার বাইরে গিয়ে ঐক্যের বার্তা দিতে পারে। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, জীবিত অবস্থায় কি এই ন্যূনতম সৌজন্য ও পারস্পরিক স্বীকৃতির চর্চা সম্ভব ছিল না? এটি আমাদের রাজনীতির নৈতিক ও মানবিক সীমারেখা নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন যেমন ক্ষমতায় থাকার অভিজ্ঞতায় ভরপুর, তেমনি ছিল দীর্ঘ কারাবাস, মামলা ও অসুস্থতার অধ্যায়। জীবনের শেষ কয়েক বছর তিনি কার্যত রাজনীতির কেন্দ্র থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন। উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে না পারা, দেশের হাসপাতালে ভর্তি হওয়া, একের পর এক শারীরিক জটিলতা- সব মিলিয়ে তাঁর শেষ সময় নিঃসঙ্গ ও নীরব ছিল। একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী, যিনি একসময় কোটি মানুষের ভোটে নির্বাচিত হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন, তাঁর শেষ জীবনের এই অধ্যায় কেবল ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও আয়না।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ব্যক্তিগত ও মানবিক সীমারেখা বারবার উপেক্ষিত হয়েছে। প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিকভাবে পরাজিত করার সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তিগত ও মানবিক মর্যাদা বজায় রাখা কতটা সম্ভব- এটি একটি প্রশ্ন যা আমরা প্রায়শই এড়িয়ে গেছি। খালেদা জিয়ার শেষ দিনগুলো এই শূন্যস্থানকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। রাজনৈতিক সংঘাত যত তীব্রই হোক না কেন, মৃত্যুর মুখে মানবিকতা, শোক ও সম্মান সবকিছুকে ছাপিয়ে যায়- এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে রাজনীতির চরম মেরুকরণের মাঝেও মানবিকতা বজায় রাখা সম্ভব।
জানাজার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি ও শোকবার্তা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে তাঁর অবস্থান স্মরণ করিয়ে দেয়। ভারত ও পাকিস্তানের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি দেখিয়েছে, তিনি কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির চরিত্র ছিলেন না; তিনি ছিলেন আঞ্চলিক রাজনীতির পরিচিত মুখ। এটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ইতিহাসেও তাঁর প্রভাব ও গুরুত্ব তুলে ধরে।
রাষ্ট্রীয় মর্যাদার আনুষ্ঠানিকতার ভিড়ে সবচেয়ে স্পর্শকাতর দৃশ্য ছিল একজন পুত্রের নীরব শোক। তারেক রহমানের কোরআন তিলাওয়াত ও জানাজায় সকলের কাছে দোয়ার আবেদন রাজনৈতিক কোলাহলকে ছাপিয়ে মানবিক আবেগকে সামনে এনেছে। মৃত্যু এক জটিল রাজনৈতিক খেলা নয়; এটি সব মানুষের জন্য সমান। রাজনীতিতে যত বড় নেতা হোক, মৃত্যু শেষ পর্যন্ত সবাইকে সমান করে দেয়- এই সত্যটি আবারও স্পষ্ট হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা ও সাধারণ ছুটি প্রমাণ করে, সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে খালেদা জিয়াকে রাষ্ট্রের ইতিহাসের অংশ হিসেবে গণ্য করেছে। এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে যদি মর্যাদা কেবল মৃত্যুর পর সীমাবদ্ধ থাকে, তবে রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতির গভীর পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাবে না। বরং প্রশ্ন তোলে- আমরা কি কেবল প্রয়োজনে উদার হই, নাকি সত্যিকার অর্থেই রাজনৈতিক সহনশীলতায় বিশ্বাস করি?
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে বিতর্ক থাকবেই। কেউ তাঁকে গণতন্ত্রের প্রতীক বলবেন, কেউ তাঁর শাসনামলের সীমাবদ্ধতা ও ব্যর্থতার কথা তুলে ধরবেন। রাজনীতিবিদদের ইতিহাসে বিতর্ক থাকাই স্বাভাবিক। তবে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর দাফন একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে- রাজনৈতিক মতভেদ সত্ত্বেও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রদের প্রতি ন্যূনতম সম্মান দেখানো রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
এই বিদায় আমাদের সামনে একটি সুযোগও এনেছে- রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, মামলাবাজি ও চরম মেরুকরণের বাইরে এসে রাজনীতিকে নতুনভাবে ভাবার। প্রশ্ন হলো, আমরা কি এই সুযোগ গ্রহণ করব? নাকি খালেদা জিয়ার দাফনের সঙ্গে সঙ্গেই আবার পুরোনো রাজনৈতিক ভাষা ও আচরণে ফিরে যাব?
খালেদা জিয়া নেই। কিন্তু তাঁর জীবন, সংগ্রাম ও অবদান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে স্থায়ীভাবে লেখা হয়ে গেছে। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর দাফন সেই ইতিহাসের ওপর একটি আনুষ্ঠানিক সিলমোহর। এখন দায়িত্ব আমাদের- এই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ার, যাতে ভবিষ্যতে রাজনীতি আরও মানবিক, সহনশীল ও গণতান্ত্রিক হতে পারে। যদি রাষ্ট্র মৃত্যুর পর সম্মান প্রদর্শন করতে পারে, তবে জীবিত অবস্থায় ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও রাজনৈতিক সৌজন্য দেখানোও অসম্ভব হওয়ার কথা নয়। খালেদা জিয়ার বিদায় অন্তত এই শিক্ষাটিই আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় মর্যাদা, রাজনৈতিক বিতর্ক ও মানবিক সংবেদন- সবকিছু মিলিয়ে এটি একটি স্মারক মুহূর্ত, যা রাজনীতিকদের এবং জনগণকে ভাবতে বাধ্য করবে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে কি আমরা শুধু ইতিহাসের পাতায় রাখব, নাকি তা জীবন্ত করব।
ডঃ এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ
লেখক, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও মানবাধিকারকর্মী

