
নিজস্ব প্রতিনিধি :
দিল্লির চানক্যপুরীর কূটনৈতিক এলাকায় বাংলাদেশের হাইকমিশনের সামনে শনিবার রাতে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে একটি বিক্ষোভের খবর হলেও, এর তাৎপর্য দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বর্তমান অবস্থাকে গভীরভাবে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। নিরাপত্তা বেস্টনি ভেদ করে একদল উগ্র হিন্দুত্ববাদী কর্মীর উপস্থিতির অভিযোগ, হাইকমিশনারকে হুমকি দেওয়ার দাবি এবং পরবর্তীতে ভারত ও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা- সব মিলিয়ে ঘটনাটি কেবল আইনশৃঙ্খলার নয়, বরং আস্থা, কূটনৈতিক দায়িত্ব ও প্রতিবেশী সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
ঘটনার পর প্রথমে নীরবতা, এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের বক্তব্য এবং তার কিছুক্ষণ পর বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টার ব্রিফিং- এই ধারাবাহিকতাই বলে দেয়, পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল না। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভকারীরা নিরাপত্তা বেস্টনি অতিক্রম করে হাইকমিশনের সামনে পৌঁছায় এবং হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহকে হুমকি দেওয়া হয়। বিপরীতে, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, এটি ছিল বাংলাদেশের ময়মনসিংহে সংঘটিত একটি ঘটনার প্রতিবাদে সীমিত পরিসরের যুব বিক্ষোভ, যেখানে নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিঘ্নিত হয়নি এবং বেস্টনি ভাঙার কোনো চেষ্টা ছিল না।
এই দুই বর্ণনার মধ্যকার ফারাকই আসলে সমস্যার মূল। কূটনৈতিক সম্পর্কে বিশ্বাসের জায়গাটি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, এমন একটি ঘটনায় দুই পক্ষের বক্তব্য যদি এত ভিন্ন হয়, তাহলে সেটি সম্পর্কের ভেতরের দুর্বলতাকেই সামনে আনে। এখানে প্রশ্ন কেবল এই নয় যে বেস্টনি সত্যিই ভাঙা হয়েছিল কি না; বরং প্রশ্ন হলো- এমন অভিযোগ উঠার মতো পরিস্থিতি কেন তৈরি হলো, এবং তা সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলো কতটা প্রস্তুত ছিল।
আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট। ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী, কূটনৈতিক মিশনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা স্বাগতিক রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য দায়িত্ব। কোনো দূতাবাস বা হাইকমিশনের সামনে অনাকাঙ্ক্ষিত সমাবেশ, স্লোগান বা হুমকির পরিবেশ তৈরি হওয়াই সেই দায়িত্ব পালনে ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়। দিল্লির মতো একটি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত কূটনৈতিক এলাকায় এমন ঘটনা ঘটার অভিযোগ উঠা স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগজনক।
এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা কঠিন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটিতে উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির উত্থান শুধু অভ্যন্তরীণ সমাজ ও রাজনীতিতেই নয়, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কেও প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশের সংখ্যালঘু পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে ভারতের কিছু গোষ্ঠীর অতিসরব ও আক্রমণাত্মক অবস্থান নতুন নয়। তবে সমস্যা হয় তখনই, যখন এই অবস্থান কূটনৈতিক শালীনতার সীমা অতিক্রম করে এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার স্পর্শকাতর এলাকায় পৌঁছে যায়।
দিল্লির ঘটনাটি সেই প্রবণতারই একটি বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক। এতে করে ভারতের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও তার উগ্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যকার দূরত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। রাষ্ট্র যদি স্পষ্টভাবে ও দ্রুত এই ধরনের কর্মকাণ্ডকে নিরুৎসাহিত না করে, তাহলে তার বার্তা প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর কাছে স্বস্তিদায়ক হয় না।
অন্যদিকে বাংলাদেশের অবস্থানও একটি সংবেদনশীল সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে দেশটি বর্তমানে রাজনৈতিক রূপান্তরের এক জটিল পর্যায়ে রয়েছে। এই সময়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কূটনৈতিক মর্যাদা, দূতাবাসগুলোর নিরাপত্তা এবং সার্বভৌম সম্মান রক্ষা করা সরকারের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে দিল্লিতে হাইকমিশনের নিরাপত্তা লঙ্ঘনের অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা বাংলাদেশের জন্য রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে প্রায় অনিবার্য ছিল।
তবে এটিও সত্য, কূটনৈতিক উত্তেজনা প্রকাশ্য বাগ্যুদ্ধের মাধ্যমে নয়, বরং নীরব সংলাপ ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমেই সমাধান হওয়া উচিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিবৃতি দেওয়া বা গণমাধ্যমের মাধ্যমে পাল্টা অবস্থান জানানোর প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। আস্থা যেখানে আগে থেকেই দুর্বল, সেখানে প্রকাশ্য বক্তব্যের সংঘাত সেই দুর্বলতাকে আরও গভীর করে।
এই ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সময়কাল। গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কে এক ধরনের অস্বস্তি লক্ষ করা যাচ্ছে। সীমান্ত ইস্যু, রাজনৈতিক বক্তব্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উত্তেজনা- সব মিলিয়ে সম্পর্কের আবহ আগের মতো স্বাভাবিক নেই। দিল্লির হাইকমিশনের সামনে ঘটে যাওয়া ঘটনা সেই পটভূমিতেই ঘটেছে, ফলে এটি বিচ্ছিন্ন নয়, বরং একটি ধারাবাহিকতার অংশ।
দুই দেশের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই বাস্তববাদী সহযোগিতার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। বাণিজ্য, যোগাযোগ, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সহযোগিতায় ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ায় একটি তুলনামূলক ইতিবাচক উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই ভিত্তিকে চাপের মুখে ফেলছে। আস্থার জায়গাটি ক্ষয়ে গেলে সহযোগিতার কাঠামোও দুর্বল হয়ে পড়ে- এ কথা ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে।
দিল্লির এই ঘটনা তাই শুধু একটি রাতের বিক্ষোভের গল্প নয়; এটি একটি সতর্ক সংকেত। উভয় দেশের জন্যই এখন প্রশ্ন হলো- এই সংকেত তারা কীভাবে গ্রহণ করবে। একদিকে আছে উত্তেজনা বাড়ানোর পথ, যেখানে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও জনমতের চাপ কূটনীতিকে ছাপিয়ে যাবে। অন্যদিকে আছে দায়িত্বশীল কূটনীতির পথ, যেখানে সংলাপ, স্বচ্ছতা ও পারস্পরিক সম্মানের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হবে।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে প্রয়োজন নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছভাবে ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে কূটনৈতিক মিশনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পেতে হবে। ভারতের পক্ষ থেকে স্পষ্ট আশ্বাস এবং বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সংযত কূটনৈতিক উদ্যোগ- এই দুইয়ের সমন্বয়ই আস্থার সংকট কাটিয়ে ওঠার পথ দেখাতে পারে।
প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক কখনোই একক কোনো ঘটনার ওপর নির্ভর করে না। কিন্তু একের পর এক ছোট ছোট অস্বস্তিকর ঘটনা জমতে জমতেই বড় সংকটে রূপ নেয়। দিল্লির কূটনৈতিক এলাকায় সৃষ্ট এই অস্বস্তি সেই জমে ওঠা সংকেতগুলোরই আরেকটি স্পষ্ট উদাহরণ। এখন দেখার বিষয়, দুই দেশ এই সংকেতকে ভবিষ্যতের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে নেবে, নাকি আরেকটি উপেক্ষিত ঘটনাতেই সীমাবদ্ধ রাখবে।
ড. এ জেড মাইনুল ইসলাম পলাশ
সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

