
নিজস্ব প্রতিনিধি :
১৬ ডিসেম্বর, মহান বিজয় দিবস। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি শুধু উৎসবের দিন নয়; এটি রাষ্ট্রের জন্মকথা, জাতির আত্মপরিচয় এবং ভবিষ্যতের দায়িত্ব স্মরণ করার দিন। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর, ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর মানচিত্রে উদ্ভব ঘটে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র- বাংলাদেশ।
বিজয় মানে আনন্দ। কিন্তু বাংলাদেশের বিজয় কেবল আনন্দ নয়; এর সঙ্গে বেদনারও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। লক্ষ মানুষের প্রাণদান, নারীর ওপর অগণিত নির্যাতন, ধ্বংসপ্রাপ্ত জনপদ ও ভেঙে পড়া অর্থনীতি- এই সকল ত্যাগ ও বেদনার মধ্য দিয়ে অর্জিত এই স্বাধীনতা। তাই বিজয় দিবস আমাদের কাছে একদিকে গৌরবের প্রতীক, অন্যদিকে গভীর আত্মসমালোচনারও উপলক্ষ।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ হঠাৎ কোনো ঘটনা ছিল না। এটি দীর্ঘ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্যের ফলাফল। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির পর থেকেই পূর্ব বাংলার মানুষ বঞ্চনার শিকার হয়। ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ছয় দফা দাবি, গণঅভ্যুত্থান- এই ধারাবাহিক সংগ্রাম স্বাধীনতার পথ তৈরি করে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সামরিক জান্তার গণহত্যার মাধ্যমে সেই সংগ্রাম সশস্ত্র রূপ লাভ করে।
নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের পর, ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি বাহিনীর প্রায় ৯১,৬৩৪ সদস্য আত্মসমর্পণ করে। ইতিহাসে এটি বিরল ঘটনা- একটি দখলদার বাহিনীর এত বড় আত্মসমর্পণ। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে জেনারেল এ.এ.কে. নিয়াজী এবং যৌথ বাহিনীর পক্ষ থেকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করেন। এর মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সামরিক অধ্যায়ের অবসান ঘটে।
বিজয়ের পেছনের বাস্তবতাও বিশ্লেষণের দাবি রাখে। মুক্তিযুদ্ধ মূলত বাঙালির নিজস্ব সংগ্রাম, যেখানে মুক্তিবাহিনীই প্রধান শক্তি। ভারতের সামরিক সহায়তা যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিলেও, যুদ্ধের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল দীর্ঘদিনের গণপ্রতিরোধ ও সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে। ইতিহাসচর্চায় এই সত্য সঠিকভাবে তুলে ধরা অত্যন্ত জরুরি।
প্রতি বছর রাষ্ট্রের উদ্যোগে বিজয় দিবস পালিত হয়। ৩১ বার তোপধ্বনি, সামরিক কুচকাওয়াজ, জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন- এইসব আয়োজন নতুন প্রজন্মকে ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করে এবং জাতীয় ঐক্যের অনুভূতি জাগ্রত করে। তবে আনুষ্ঠানিকতার বাইরে বিজয় দিবস আমাদের কী শেখায়- এই প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজে নিতে হবে।
বিজয়ের ৫০ বছরের বেশি সময় পরও বাংলাদেশ নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। অর্থনৈতিক কিছু সূচক ইতিবাচক হলেও, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সমস্যা কমেনি। বৈষম্য কমেনি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায়, দুর্নীতি কাঠামোগত সমস্যায় রূপ নিয়েছে, এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রত্যাশিত শক্তি অর্জন করতে পারেনি। এসব বাস্তবতা মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ- এটি ভাবার বিষয়।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার। কিন্তু আজকের বাংলাদেশে এই চেতনাকে প্রায়ই রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হয়। ইতিহাসের নির্বাচিত পাঠ তুলে ধরে ভিন্নমতকে দমন করার প্রবণতাও দেখা যায়। এতে মুক্তিযুদ্ধের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়, এবং গণতান্ত্রিক পরিসরও সংকুচিত হয়।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণ ও গবেষণা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এখনও বিভ্রান্তি, ভুল তথ্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যাখ্যা ছড়িয়ে পড়ে। প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা, নির্ভরযোগ্য আর্কাইভ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের অভিজ্ঞতার দলিলীকরণ জোরদার করা প্রয়োজন। ইতিহাস বিকৃত হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সঠিক দিকনির্দেশনা পায় না।
নতুন প্রজন্মের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের সংযোগও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডিজিটাল যুগে বেড়ে ওঠা তরুণদের কাছে ১৯৭১ অনেক সময় দূরের গল্প মনে হয়। পাঠ্যবইয়ের বাইরে মুক্তিযুদ্ধকে জীবন্ত করে তোলার দায়িত্ব রাষ্ট্র ও সমাজ- উভয়ের। বিজয় দিবস সেই সুযোগ তৈরি করে, যদি সেটিকে কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রাখা হয়।
বিজয় দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়- স্বাধীনতা একটি চলমান প্রক্রিয়া। ১৯৭১ সালে আমরা ভৌগোলিক স্বাধীনতা অর্জন করেছি, কিন্তু অর্থনৈতিক মুক্তি, সামাজিক ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করার সংগ্রাম এখনও চলমান। এই বাস্তবতা স্বীকার করাই মুক্তিযুদ্ধের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা।
আজকের দিনে শহীদদের স্মরণ মানে শুধু ফুল দেওয়া নয়; তাঁদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার চেষ্টা করা। যেখানে নাগরিক অধিকার সুরক্ষিত থাকবে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত হবে, এবং রাষ্ট্র সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করবে। বিজয়ের প্রকৃত অর্থ তখনই পূর্ণতা পায়।
মহান বিজয় দিবসে তাই আমাদের প্রত্যাশা একটাই- ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া। গৌরবকে ধারণ করে, বেদনাকে স্মরণ করে এবং দায়িত্বকে উপলব্ধি করে একটি ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও মানবিক বাংলাদেশ গড়াই হোক এই দিনের অঙ্গীকার।
ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ
লেখক, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও মানবাধিকারকর্মী

