
মো: মাসুম বিল্লাহ-খুলনা :
পিলখানায় কিলিং মিশন চালিয়েছে “ব্ল্যাক ক্যাটস” কমান্ডো ফোর্সের একটি স্কোয়াড। ভারতের NSG কমান্ডোর নিক নেইম হলো ব্ল্যাক ক্যাটস।
বিডিআর জওয়ানদের জবানবন্দি অনুযায়ী পিলখানায় ১২-১৪ জনের একটা টিম মুল হত্যাকান্ড চালায়, যাদের কাউকে এর আগে কখনো দেখেনি, এদের পরনে বিডিআর ইউনিফর্ম ছিলো একেবারে নতুন, মুখ কাপড়ে বাধা, কারো চুল ছিলো লম্বা, অথচ সেনা আইনে লম্বা চুল নিষিদ্ধ। এরা নিজেদের মধ্যে হিন্দিতেও কথা বলছে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসান নাসেরের নেতৃত্বে তদন্ত টিমের ইনভেস্টিগেশনে ১৪ সদস্যদের ব্ল্যাক ক্যাটস টিমের অস্তিত্ব প্রমানিত হয়। তবে উইকিলিক্সের ফাঁস হওয়া নথি অনুযায়ী এই মিশনে ব্ল্যাক ক্যাটসের সদস্য সংখ্যা ছিল ১৫ জন।
ব্ল্যাক ক্যাটসের উপস্থিতি নিয়ে মুখ খোলায় তৎকালীন ৪৬ ব্রিগেডের কমান্ডার মেজর সুমনকে গুম করা হয়। তদন্ত কমিটির সদস্য ক্যাপ্টেন শাহনাজকে চাকরিচ্যুত করা হয়৷ এছাড়া যাদেরকে চুপ করানো যায়নি তাদেরকে হ’ত্যা করা হয়। হত্যাকান্ড শুরু হবার কিছুক্ষন আগেই মেজর তানভির NSG কমান্ডোদের উপস্থিতি টের পেয়ে স্ত্রীকে টেলিফোনে বিষয়টি জানায়। উল্লেখ্য, মেজর তানভির আজ পর্যন্ত নিখোঁজ, তার লাশও পাওয়া যায়নি।
২৪শে ফেব্রুয়ারী রাতে বেনাপোল বন্দর দিয়ে ব্ল্যাক ক্যাটস কমান্ডো টিম বাংলাদেশে প্রবেশ করে। রাজধানীর ফার্মগেটে অবস্থিত ইম্পেরিয়াল গেস্ট হাউজ নামের একটা হোটেলে তারা রাত্রিযাপন করে এবং সকাল ৯টা পর্যন্ত সেখানেই অবস্থান করে। এই হোটেলের মালিক আওয়ামী লীগ নেত্রী, তৎকালীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী শাহারা খাতুন।
সকাল ৯.২০ মিনিটে ধুসর বর্নের একটা মাক্রোবাসে করে কিলার টিম বিডিআরের পোশাক পরিহিত অবস্থায় পিলখানায় প্রবেশ করে। আগেরদিন রাতে ব্যারিস্টার ফজলে নুর তাপোস এই পোশাকগুলো সর্বরাহ করেছিলো।
০৯:২৬ মিনিটে কেন্দ্রীয় ইশারায় ৪৪ ও ৩৬ ব্যাটালিয়নের বিডিআর সৈনিকরা বিদ্রোহ শুরু করে। যদিও তাদের হাতে লাইভ এ্যামুনিশন ছিলোনা, ছিলো ট্রেনিং এ ব্যাবহৃত ব্ল্যাংক এ্যামুনিশন। ১০.২০ মিনিটে আওয়ামী লীগ নেতা হাজি সেলিমের পাঠানো একটি পিকআপ ভ্যান অস্ত্র নিয়ে পিলখানায় প্রবেশ করে। এই পিকআপেই সাধারন অস্ত্রের পাশাপাশি ছিলো ব্ল্যাক ক্যাটসের ব্যাবহৃত স্পেশাল এসল্ট রাইফেল এবং গিয়ার সমূহ।
১১ টার কিছুক্ষণ আগে কিলিং শুরু হয়। পিলখানায় সেদিন ১৩২ জন অফিসার থাকলেও সবাইকে হত্যা করা হয়নি। কিলার টিম বেছে বেছে লিস্টেড কিছু অফিসারকে হত্যা করে। দরবার হলেই অধিকাংশ অফিসার ব্রাশ ফায়ারে নিহত হয়। বাকিরা লুকিয়ে পরলে তাদেরকে খুঁজে খুঁজে বের করে হত্যা করে।
২৫ তারিখ রাত ৯ টা নাগাদ কিলিং শেষ হয়। এরপর শাহারা খাতুন রেড ক্রিসেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর স্পেশাল এ্যাম্বুলেন্স সহ ৪টি গাড়ির বহর নিয়ে পিলখানায় প্রবেশ করে, এবং বেরুবার সময় কিলাররা শাহারা খাতুনের সাথে এ্যাম্বুলেন্সে করে বেরিয়ে আসে। সেসময় কিছুক্ষণের জন্য পিলখানার বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ রাখা হয়, যেন কিলারদের বেরিয়ে যাওয়া কেউ টের না পায়।
ব্ল্যাক ক্যা্টস কিলারদের একটা টিম সেদিন রাতেই শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হয়ে মধ্যপ্রাচ্চ্যে পালিয়ে যায়, আরেকটা টিম ২৮ তারিখ রাতে সোহেল তাজের সহায়তায় সিলেট বিমানবন্দর হয়ে দেশ ছেড়ে যায়।
বলা হয় পিলখানায় ৫৭ জন সেনা অফিসার মারা গেছে, তবে তথ্যটি পুরোপুরি সঠিক নয়। মুলত পিলখানায় ৭৪ টি লাশ পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ৫৭ টি লাশ অফিসারদের বলে শনাক্ত করা হয়। বাকি লাশ গুলোর কয়েটার পরিচয় পাওয়া গেলেও কিছু লাশের পরিচয় আজও পাওয়া যায়নি। এমনকি এখনো একাধিক অফিসার নিখোঁজ আছে, মেজর তানভির, বিডিয়ারের এডি আওয়াল অন্যতম।
মৃত ৭৪ জনের সবাইকে কি ভারতীয় কিলাররাই মেরেছে? না, বিডিআর সেনাদের হাতেও কয়েকজন মরেছে। গোলাগুলি শুরুর আগেই পিলখানায় মব সৃষ্টি হয়। অনেক অফিসারকে ধরে পেটানো হয়। যাদের আঘাত গুরুতর ছিলো তাদের কয়েকজন চিকিৎসার অভাবে মারা যায়। তবে সৈনিকরা কোনো অফিরারকে গুলি করে হত্যা করেনি। মব করেছে মাত্র ৪০-৫০ জনের একটা উগ্র গ্রুপ, যাদেকে তাপোস ও নানকরা মিলে আগে থেকেই ট্রেনিং দিয়েছিলো।
উপরোক্ত তথ্যগুলো কোনো সিক্রেট বা স্পেশাল তথ্য নয়, এগুলো সব ওপেন ডকুমেন্ট। সেনাবাহিনী থেকে শুরু করে প্রশাসন ও রাজনৈতিক দলগুলোও এ সম্পর্কে পুরোপুরি জ্ঞাত। ভারতীয় ইনভল্বমেন্টে পিলখানা গনহত্যা এখন আর কোনো সিক্রেট বিষয় নয়।
আজকে বাংলাদেশের ইতিহাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা দিন। আজকে পিলখানা গনহত্যা তদন্তের রিপোর্ট প্রকাশ করা হবে। কিন্তু এই রিপোর্টে কি আসল ঘটনা প্রকাশ করা হবে? সম্ভাবনা খুব কম৷ আওয়ামী লীগের ইনভল্বমেন্ট সম্ভবত প্রকাশ করা হবে, কিন্তু ভারতীয় ইনভল্বমেন্ট সুকৌশলে এড়িয়ে যাবার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে।
কারন পিলখানা গনহত্যার কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। এটা শাপলা চত্বরে হেফাজত গনহত্যা, জুলাই গনহত্যা, বা হাসিনার ২৫০ বিলিয়ন ডলার পাচারের মত ঘটনা নয়৷ এটা তারচেয়েও অনেক বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। এখানে ভারত প্রত্যক্ষভাবে একটা দেশের স্বাধীনতা ও স্বার্বোভৌমত্বের উপর আঘাত করেছে। এই ঘটনা পুরো সাউথ এশিয়ান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পাল্টে দেবার জন্য যথেষ্ট।
পিলখানা গনহত্যার ভারতীয় ইনভল্বমেন্ট যদি সরকারি ভাবে ঘোষণা করা হয়, তাহলে ভারতের সাথে সমস্ত চুক্তি স্থগিত হয়ে যাবে, ভারতকে রাষ্ট্রিয় ভাবে শত্রু ঘোষণা করা হবে, ভারতের সাথে সব ধরনের সামরিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক নিষিদ্ধ হয়ে যাবে। ভারত আন্তর্জাতিক ভাবে ব্যাপক চাপে পড়বে।
কিন্তু এতবড় ঘটনা হ্যান্ডেল করার মত মেরুদন্ড বা স্বদিচ্ছা কি ইউনুস সরকারের আছে ? পিলখানা গনহত্যার বিচার দেখার অপেক্ষায় পুরো বাংলাদেশ।

