
নিজস্ব প্রতিনিধি :
মাদারীপুরে বিএনপির মনোনয়ন ঘোষণার পর থেকে প্রার্থীদের নিয়ে নানা বিতর্ক। মাদারীপুর-১ আসনে একজনকে মনোনয়ন দেয়ায় আরেক মনোনয়ন প্রত্যাশীর সমর্থকরা বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ, গাড়ি ভাঙচুর ও রাস্তায় অগ্নিসংযোগ করে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানায়। এদিকে স্থগিত আসনের প্রার্থীর মনোনয়ন পুনর্বহালের দাবিতে দফায় দফায় বিক্ষোভ সমাবেশ করছে তার সমর্থকরা। জয়বাংলা বলার কারণে এ আসনের প্রার্থিতা স্থগিত হয়েছে বলে অনেকের দাবি।
মাদারীপুর-৩ আসনের প্রার্থী ধর্ষণ মামলায় অভিযুক্ত। কোর্টের আদেশে মামলা এজাহারভুক্ত করেছে উত্তরখান থানা পুলিশ। অভিযোগ অস্বীকার করে নিজেকে নির্দোষ দাবি অভিযুক্ত বিএনপি নেতার।
ঘোষণা করা হয়। ওই নেতাদের ব্যক্তিগত অন্যায় অপরাধের প্রভাব দলের উপরে পড়ে। তাই দলের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে সকলকে সংযত থাকার অনুরোধ কেন্দ্রীয় নেতাদের। জানা যায়, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে গত ৩ নভেম্বর সারাদেশ ২৩৭ টি আসনে মনোনয়ন চূড়ান্ত করে বিএনপি।
ওই দিন মাদারীপুরে ৩টি আসনের মধ্যে দুটিতে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। মাদারীপুর-১ আসনে কামাল জামান নুরুদ্দিন মোল্লা এবং মাদারীপুর-৩ আসনে আনিসুর রহমান খোকন তালুকদারের নাম।
সন্ধ্যায় মাদারীপুর-১ আসনে কামাল জামান নুরুদ্দিন মোল্লাকে মনোনয়ন দেয়ায় বিএনপির মনোনয়ন বঞ্চিত সাজ্জাদ হোসাইন পান সিদ্দিকীর সমর্থকরা বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ, গাড়ি ভাঙচুর ও রাস্তায় অগ্নিসংযোগ করে প্রতিক্রিয়া জানায়। এছাড়া মনোনয়ন পাওয়া কামাল জামান নুরুদ্দিন মোল্লার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে যেখানে বক্তব্যের শেষ প্রান্তে এসে সে জয় বাংলা” বলে জিহ্বায় কামড় দেন কামাল জামান নুরুদ্দিন মোল্লা। পরের দিন ৪ নভেম্বর সন্ধ্যায় বিএনপির মহাসচিব বিজরী আহমেদ স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞান্তির মাধ্যমে অনিবার্য কারণ দেখিয়ে মাদারীপুর-১ (শিবচর) আসনের মনোনয়ন স্থগিত করেন। এর পর ৫ নভেম্বর থেকে অবিলম্বে কামাল জানান মোল্লার মনোনয়ন পুনর্বহালের মাধিতে দফায় দফায় বিক্ষোভ সমাবেশ করছে তার সমর্থকরা। তার মনোনয়ন পুনর্বহাল করা না হলে কঠোর আন্দোলনের মাধ্যমে ঢাকা-খুলনা-বরিশাল মহাসড়ক অবরোধের হুঁশিয়ারি দেয় কর্মী সমর্থকরা।
মাদারীপুর-০৩ আসনে আনিসুর রহমান খোকন তালুকদারের মনোনয়ন পাওয়ায় ওই আসনের (কালকিনি, ভাসার উপজেলাসহ সদরের একাংশ) নেতাকর্মীদের মাঝে আনন্দের জোয়ার দেখা যায়। সেই আনন্দ কিছুটা মলিন হয়েছে ওই আসনের প্রার্থী বিএনপির সহ গণশিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক আনিসুর রহমান খোকন তালুকদারের বিরুদ্ধে একটি ধর্ষণ মামলা হওয়ায়। বিষয়টি বিশ্বাস করে কোনভাবেই মেনে নিতে পারছে না দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা। সে মনোনয়ন পাওয়ায় তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হিসেবে কোন একটি চক্র এটা করাতে পারেন বলে তাদের দাবি। বিগত ২২ অক্টোবর চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ঢাকার উত্তরখান থানাধীন চামুর খান এলাকার একটি বাসায় নিয়ে এক নারীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক ধর্ষণ করার অভিযোগ তোলেন। সেদিন ওই থানা মামলা করতে গেলে ভুক্তভোগীকে আদালতে মামলা করার পরামর্শ দেন। পরে গত ২৭ অক্টোবর ঢাকার বিজ্ঞা-নারী শিশু ট্রাইবুনালে একটি পিটিশন মাম দায়ের করেন ভুক্তভোগী ওই নারী।
বিজ্ঞ আদালত মেডিকেল রিপোর্ট পর্যালোচনা করে মামলাটি এজাহার হিসেবে রেকর্ড করার জন্য উত্তরখান, থানার ওসিকে নির্দেশ দেন। উত্তরখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা চলতি মাসের ০৩ তারিখে মামলাটি এজাহার হিসেবে গণ্য করে নেন (মামলা নং-১) মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে। চলতি মাসের ৫ তারিখে ঢাকার ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলন করেন। এছাড়া ধর্ষণ মামলার প্রধান আসামী আনিসুর রহমান তালুকদার খোকন তালুকদারের বিরুদ্ধে বিএনপির প্রভাব খাটিয়ে মামলার তদন্তে বাধা সৃষ্টি করার অভিযোগ আনেন ধর্ষণ মামলার ওই বাদী। এছাড়া ন্যায় বিচার পাওয়া, বিএনপির সকল পদ থেকে ডাকে বহিষ্কারের দাবি জানিয়ে ও বিচার নিশ্চিত করার জন্য বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বরাবর একটি আবেদনও করেন।
এ বিষয়ে মামলার বাদী ভূক্তভোগী ওই নারী বলেন, ঘটনার দিন চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে গেলে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে তারা বলেন এটা পুলিশ কেন। এই সে অনেক ভয় পেয়ে যায়। তারে খোজার জন্য পুরা এলাকায় লোকজন দিয়ে দিয়ে রেখেছে আসামীরা। লোক মারফর ২৫ লাখ টাকা পাঠাইছিল মীমাংসার জন্য। ২৫ লাখ কেন ২৫ কোটি হলেও মীমাংসায় যাব না। আসামীকে এরেস্ট করুক, তার ফাঁসি হোক। সম্মান নিয়ে কোন সমঝোতা নাই। সঠিক বিচার দাবি করেন তিনি।
অভিযোগ অস্বীকার করে ও সৃষ্টিকর্তার কাছে বিচার দিয়ে আনিসুর রহমান তালুকদার খোকন বলেন, তার জনপ্রিয়তা ও দলের জন্য নাগের কথা সবাই জানে। দলের নেতাকর্মীদের একসাথে কাজ করতে জেলার সব জায়গায় বিচরন করেছি। তারেক রহমানসহ দলের কাছে ছোট করতে ও তার সম্মান ক্ষুন্ন করতে একটি চক্র কাজটি করিয়েছে। সেই নারী ও চক্রটি মিলে যা করেছে আল্লাহ অবশ্যই এর বিচার করবে।
এ ব্যাপারে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক এ্যাড. জাফর আলী মিয়া বলেন, ন্যায় সঙ্গত অধিকার পাওয়ার জন্য কেউ সমাবেশ বা বিক্ষোভ করতে পারে। তবে সে কারণে যেন জনদুর্ভোগ সৃষ্টি না হয় সে বিষয়ে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে। এছাড়া কারও কোন দাবি দাওয়া থাকলে তা দলের নির্দিষ্ট ফোরামে আলোচনার মাধ্যমে উপস্থাপন করাই ভালো। আরেক প্রার্থীর বিরুদ্ধে যে মামলা হয়েছে তা শুনেছি। যতটুকু জানি, মামলাটি তদন্তাধীন আছে। এখনো তাকে সম্পূর্ণভাবে দোষী বলা যায় না। আপনি প্রতিবেদক, আপনার প্রশ্নের উত্তরে বলতে চাই, ধর্ষণ মামলাটি নিয়ে অন্যকোন দলের কর্মী বা প্রার্থী যদি নিজেদের স্বার্থের কারণে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করে তাও নীতিগতভাবে না।
দুটি ঘটনা জেলার বিএনপি নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ভাবিয়ে তুলছে। দলের কথা বিবেচনা করে সকলকে সংযত থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা। এখনো মাদারীপুর-২ আসনে (মাদারীপু সদর কিছু অংশ ও রাজৈর উপজেলা বিএনপির কোন প্রার্থীর নাম ঘোষণা না করার মে প্রত্যাশীরা জোর প্রচারণা নির্বাচনী এলাকা হিসেবে এ আসনে রয়েছেন ভোলা বিএনপির সদস্য সচিব হার জাহান, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক, কলেজের সাবেক ভিপি ও সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক এমপি হেলেন জেরিন খান, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি, বাংলাদেশ হিন্দু- বৌদ্ধ-খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্টের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও মাদারীপুর জেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটির সদস্য মিন্টন বৈদ্য, মাদারীপুর জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব ও মাদারীপুর সরকারি কলেজের সাবেক ভিপি অ্যাডভোকেট মাসুদ পারভেজ ও সাবেক ছাত্রদল নেতা ব্যারিস্টার শহীদুল ইসলাম খান। মাঝে মাঝে একই এলাকায় পাল্টাপাল্টি কর্মসূচির আয়োজনও হয়ে যায় মনোনয়ন প্রত্যাশীদের। এতে দলের নেতাকর্মীরা দ্বিধা বিভক্তিতে পড়ে যান।
মনোনয়ন প্রত্যাশী সাজ্জাদ হোসাইন লাভলু সিদ্দিকী বলেন, একটা দলের সংসদ সদস্য হতে হলে তাকে অবশ্যই দলের প্রতি আস্থা ও প্রজ্ঞাশীল হতে হবে। প্রার্থীর নিজের এবং তার পরিবারের সদস্যদের কর্মকান্ডে সাধারণ মানুষকে বিরাগ ভাজন করা যাবে না। টাকার বিনিময়ে লোক এনে জনপ্রিয়তা দেখানো আর মানুষের ভালোবাসা নিয়ে আসা কর্মী সমর্থকদের মধ্যে অবশ্যই তফাৎ আছে। শিবচরের বিএনপির নেতাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলে ও সংযত থাকলে ভালো হতো। যোগ্য প্রার্থী দিলে এ আসন বিএনপির হাতছাড়া হবে না ইনশাআল্লাহ।
আরও কয়েকজন মনোনয়ন প্রত্যাশী বলেন, দলের কাছে মনোনয়ন চেয়েছিলাম। যেভাবেই হোক দলকে বুঝিয়ে একজন মনোনয়ন নিয়ে আসে। একদিন পরেই তার জন্য স্থগিত আদেশ দেয় দল। যার মনোনয়ন স্থগিত করা হয়েছে তার মুখে এখনো “জয়বাংলা চলে আসে। জয়বাংলা বলে ফেলা ব্যক্তি কখনো বিএনপির ঘাটি কর্মী হতে পারে না । সেই বক্তব্য ও আওয়ামীলীগের বড় বড় নেতাদের সাথে তার গভীর সম্পর্কের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। জনপ্রিয়তা বলতে জনগণের ভালবাসাকে বুঝি, অর্থের বিনিময় নয় লোক আনাকে নয়। দল যাকে মনোনয়ন দিবে তার কাজ করতে হবে, অবশ্যই করবো।
শিবচর উপজেলা বিএনপির আহবায়ক শাহাদাত হোসেন খান বলেন, বিএনপিকে ভালবাসি। বিএনপি যাকে মনোনয়ন দিবে তার জন্য কাজ করবো তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই। সে (জামান মোল্লা) মনোনয়ন নিয়ে আসছিল তার জন্য কাজ করেছি। এছাড়া বিএনপিতে কয়েকটি গ্রুপ আছে এখানে। সে রাজপথে ছিল বিধায় আমি তার গ্রুপে ছিলাম। এ উপজেলায় যারা বিএনপি করে দল করতে হলে যাকে মনোনয়ন দিবে তার জন্য কাজ করতে হবে, করতে বাধ্য।
এ বিষয়ে কামাল জামান নুরুদ্দিন মোল্লা (মাদারীপুর-০১ আসন) বলেন, পুরো শিবচর উপজেলার জনগণ ও নেতাকর্মীরা তার সাথে আছে। তিনি আশা করেন দল তার মনোনয়ন পুনর্বহাল করবে। প্রতিদ্বন্দ্বীরা অনেকেই অনেক কথা বলেছেন বা বলবেন। প্রযুক্তির অপব্যবহার করে ( এ আইসহ অনেক সফটওয়ার) বক্তব্যটা বিকৃতভাবে উপস্থাপন করেছে। দুর্দিনে দলের সাথে ছিলাম, আছি এবং থাকবো। আশাকরি দল পুনরায় সে সম্মান ফিরিয়ে দিবে। বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ সাংগঠনিক সম্পাদক খন্দকার মাশুকুর রহমান মাশুক বলেন, দল সম্ভাব্য প্রার্থীদের একটি তালিকা দিয়েছে। এটাকেই শতভাগ নিশ্চিত ধরা যাবে না। যে কোন কারণে প্রার্থী পরিবর্তনও দল করতে পারে কোন প্রার্থী যদি অনৈতিক কাজের জন্য অভিযুক্ত হয় সেটা দলের দায়িত্বশীলরা অবশ্যই আমলে নিয়ে খতিয়ে দেখবে। তবে দলের কোন নেতা বা কর্মীর অপকর্মের দায়ভার দলের উপর দারুনভাবে প্রভাব পড়ে। দলের কথা চিন্তা করে নেতাদের অনৈতিক কর্মকান্ড না করাই উত্তম।
বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক হেলেন জেি বলেন, মাদারীপুর-১ আসন নিয়ে অনেকদিন ধরে আলোচনা হচ্ছে। রে কথা চিন্তা করে সকলের সহনশীল হয়ে দলের সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করাই মঙ্গলকর। ৩ আসনের প্রার্থীর মামলার বিষাটি শুনেছি তবে নিজের কর্ম ব্যস্ততায় সঠিক তথ্য এখনো জানতে পারিনি। তবে প্রতিটি নেতা দলের নিক চিন্তা করে পা বাড়ানো উচিত। ব্যক্তির চেয়ে দল বড়। কোন ব্যক্তির কারণে দলের যেন কোন ক্ষতি না হয়। সে বিষয়ে সকলের সতর্ক থাকা উচিৎ।

