
রোজার ঈদে একদফা পণ্যের দাম বেড়েছিল। পরে কুরবানির ঈদ ঘিরে আরও কিছু পণ্যের দাম বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু বাজারে এসব পণ্যের কোনো সংকট না থাকলেও এগুলোর আর দাম কমেনি। এতে নিম্নবিত্ত ছাড়াও মধ্যবিত্তদেরও নাভিশ্বাস বেড়েছে। আর খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের অনেকে এখন সাধ ও সাধ্যের মধ্যে মাছ-গোশত পর্যন্ত কিনতে পারছেন না। গরিবের জন্য বাজার করা এখন সবচেয়ে কষ্ট আর হতাশার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির ভারে ন্যুব্জ সাধারণ মানুষ। এর মধ্যেই বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এর মধ্যেই সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির আভাস দিয়েছে সরকার। ফলে বেসরকারি চাকরিজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।
দেশের লোকসংখ্যা প্রায় ৫১ কোটি হলেও সরকারি চাকুরীজীবি সংখ্যা মাত্র ১৫ লাখ। ফলে বড় অংশের মানুষের আয় বাড়ছে না। হিসাব পাল্টাচ্ছে শুধু সরকারি কর্মকর্তার। এর ফলে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রভাব তথা মূল্যস্ফীতির বোঝা সরাসরি সাধারণ মানুষের কাঁধে এসে পড়ছে।
সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ১৪০% পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। বিদ্যমান সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮,২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০,০০০ টাকা মোট বেতন ৪২০০০ এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১,৬০,০০০ টাকা করার কথা বলা হয়েছে। অন্যান্য ভাতা ২০% থেকে বাড়িয়ে ৫০% করাসহ যাতায়াত ভাতাও বৃদ্ধির সুপারিশ রয়েছে। যা সব মিলিয়ে ৩ লাখ টাকার উপরে পৌছায়।
বেতন বৃদ্ধি পেলে সরকারি চাকরিজীবীদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে। ফলে বিভিন্ন পণ্য ও সেবার চাহিদাও বৃদ্ধি পাবে।
যদি সেই অনুপাতে বাজারে সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়, তাহলে মূল্যবৃদ্ধি সীমিত রাখা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু অতীতে দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে বাড়তি চাহিদার সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেন।
নতুন পে-স্কেলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দিতে গিয়ে যে বাড়তি বেতনের অর্থের প্রয়োজন হবে, সেটির জন্য সরকারকে ঋণ নিতে হবে বা নতুন করে টাকা ছাপাতে হবে।
বাড়তি ওই টাকা অর্থনীতিতে যোগ হলেই সার্বিক মুদ্রাস্ফীতি আরও বেড়ে যাবে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা বাবদ প্রায় ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পেনশন ও গ্রাচুইটিসহ যা এক লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা।
বাজেটের ‘জনপ্রশাসন-নিট’ খাতে চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
কিন্তু বাড়তি এই ব্যয়ের বিপরীতে সরকার আয় তো সেভাবে বাড়ছে না, বরং নতুন বাজেটে যে বিপুল অর্থের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে, সেটা মেটাতেই সরকারকে দেশে-বিদেশে ঋণের দিকে ঝুঁকতে হবে।
এক্ষেত্রে বিদেশি সংস্থার কাছ থেকে ঋণ নিয়ে ঘাটতি পূরণ করতে হলে অর্থনীতি বাড়তি চাপ সৃষ্টি হবে।
আবার দেশি ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ নিলে সেখানে তারল্য সংকট দেখা দিবে।
সরকারী কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর বৃদ্ধি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরা তীব্র ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানায়। তাদের ভাষায় ‘আমরা যে বেতন পাই। তা দিয়ে সংসার চালাতে খুব কষ্ট হচ্ছে। খেয়ে বেঁচে থাকতে অল্প পরিমাণে পণ্য কিনতে হচ্ছে। অন্যদিকে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ভারসাম্যহীনভাবে বৃদ্ধি হচ্ছে। তারা স্বাচ্ছন্দ্যে দিন কাটালেও আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।’
মূল্যস্ফীতির চাপে সবাই পিষ্ট। সরকারি কর্মচারীদের প্রণোদনা দেওয়ায় তাদের স্বস্তি হবে। কিন্তু বাকি জনগণের কী হবে? কারণ বাজারে সবাই যায়। তাই সরকারের উচিত হবে, দেশের সব মানুষের জন্য মূল্যস্ফীতি কমানোর ব্যবস্থা করা। পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে আনার ব্যবস্থা করা।
মাত্র ১৫ লাখ সরকারী কর্মচারীদের জন্য সব সুবিধা বরাদ্দ না করে দেশের মালিক জনগণের সুবিধার জন্য কাজ করা। কারণ সংবিধান মোতাবেক সরকারী কর্মচারীরা সেবক। জনগণ মালিক। সরকার জনগণের মালিকানা থেকে অন্যায্যভাবে সেবককেই সব দিচ্ছে। এর অবসান দরকার।

