
নিজস্ব প্রতিনিধি :
ইসলামে কুরবানি শুধু পশু জবাইয়ের নাম নয়; বরং এটি আত্মত্যাগ, তাকওয়া, বিনয় ও মানবতার এক মহান শিক্ষা। আল্লাহ তাআলা কুরআনে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, কুরবানির পশুর গোশত বা রক্ত তাঁর কাছে পৌঁছে না; বরং পৌঁছে মানুষের অন্তরের তাকওয়া ও আন্তরিকতা।
“আল্লাহর কাছে পৌঁছে না তাদের গোশত ও রক্ত, বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।”
— (সূরা আল-হাজ্জ: ৩৭)
কুরবানির মূল উদ্দেশ্য
কুরবানির মাধ্যমে মানুষ নিজের ভেতরের লোভ, অহংকার, কৃপণতা ও আত্মকেন্দ্রিকতাকে দমন করার শিক্ষা পায়। হযরত ইবরাহিম (আ.) ও হযরত ইসমাঈল (আ.)-এর ত্যাগের ইতিহাস মুসলমানদের শেখায়—আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রিয় জিনিসও ত্যাগ করতে প্রস্তুত থাকতে হবে।
কিন্তু বর্তমান সমাজে কখনো কখনো দেখা যায়, কুরবানিকে ইবাদতের পরিবর্তে সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শনের মাধ্যম বানানো হয়। বড় পশু, দামি পশু কিংবা বাহ্যিক আয়োজন নিয়ে প্রতিযোগিতা চলে। কেউ কেউ দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষদের অবজ্ঞার চোখে দেখে অথবা মনে করে তারা শুধু গোশত নেওয়ার জন্য আসে। এই ধরনের মানসিকতা ইসলামের সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও মানবিকতার পরিপন্থী।
অহংকার সম্পর্কে ইসলামের অবস্থান
ইসলামে অহংকারকে কঠোরভাবে নিন্দা করা হয়েছে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন—
“যার অন্তরে সরিষা পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।”
— (সহিহ মুসলিম)
অহংকার মানুষের হৃদয়কে কঠিন করে দেয় এবং মানুষকে অন্যের মর্যাদা ভুলিয়ে দেয়। নূহ (আ.)-এর কওমের ধনী ও ক্ষমতাবান লোকেরা গরিবদের “নিম্নশ্রেণির মানুষ” মনে করত এবং তাদের সাথে সম্পর্ক রাখতে অপমানবোধ করত। কুরআনে এই মানসিকতাকে সত্য গ্রহণের বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
— (সূরা হুদ: ২৭)
কুরবানির সামাজিক শিক্ষা
ইসলামে কুরবানির গোশত আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও দরিদ্র মানুষের মাঝে বণ্টনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে সমাজে সহমর্মিতা, ভালোবাসা ও সাম্যের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। ধনী-গরিবের ভেদাভেদ ভুলে সবাই একসাথে আনন্দ ভাগাভাগি করার শিক্ষা ইসলাম দেয়।
যদি কুরবানি মানুষের মাঝে দয়া, নম্রতা ও ভ্রাতৃত্ব সৃষ্টি না করে, তবে সেই কুরবানির প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণ হয় না। কুরবানি কখনো প্রদর্শন বা সামাজিক প্রতিযোগিতার বিষয় হতে পারে না। এটি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য একান্ত ইবাদত।
উপসংহার
কুরবানির প্রকৃত শিক্ষা হলো—মানুষকে বিনয়ী, উদার ও মানবিক করে তোলা। তাই কুরবানির সময় দরিদ্র মানুষকে ছোট করা, সামাজিক মর্যাদা নিয়ে অহংকার করা কিংবা কুরবানিকে প্রতিযোগিতার মাধ্যম বানানো একজন মুসলমানের জন্য অনুচিত। আমাদের উচিত কুরবানির আত্মিক শিক্ষা গ্রহণ করে সমাজে ভালোবাসা, সাম্য ও মানবিকতা প্রতিষ্ঠা করা।

