রাত গভীর হলে গ্রামটার ওপর যেন অন্য এক পৃথিবী নেমে আসত। চারদিকে এমন নিস্তব্ধতা, যেন দূরের বাঁশঝাড়ে বাতাসের ফিসফিসানিও শোনা যায়। সেই নীরবতার বুক চিরে কেবল ঝিঁঝি পোকার একটানা ডাক আর হারিকেনের ক্ষীণ শিখার কাঁপুনি।
সেই আলোয় মাথা নিচু করে বসে আছে আলম। সামনে খোলা ইংরেজি বই। পরদিন ক্লাস এইটের বার্ষিক পরীক্ষা। ঘুমে চোখ জড়িয়ে এলেও বই বন্ধ করার সাহস নেই। দারিদ্র্য তাকে শিখিয়েছে—স্বপ্ন দেখতে হলে জেগে থাকতে হয়।
উঠান থেকে মায়ের স্নেহমাখা কণ্ঠ ভেসে এল—
— “আলম, আর কত পড়বি বাবা? চোখ দুটো নষ্ট হয়ে যাবে। এবার শুয়ে পড়। ভোরে উঠে আবার পড়িস।”
আলম মৃদু হেসে বলল,
— “ভোরে তো আর সময় পাব না, মা।”
সত্যিই তো। ভোরের আলো ফোটার আগেই বাবা লাঙল কাঁধে ক্ষেতে চলে যান। মা ঝাড়ু দেন উঠানে, হাঁস-মুরগি ছেড়ে দেন, চুলায় আগুন ধরান। তারপর স্কুলে যাওয়ার তাড়া। তাই রাতটাই ছিল আলমের নিজের সময়, নিজের স্বপ্নের সময়।
হারিকেনের তেল ফুরিয়ে এলে মা ছোট্ট চেরাগে আগুন ধরিয়ে দিতেন। সেই হলদে আলোয় আবার খুলে যেত বইয়ের পাতা। আলো ছিল ক্ষীণ, কিন্তু স্বপ্ন ছিল উজ্জ্বল।
সেটা নব্বইয়ের দশক।
বরিশালের ছোট্ট গ্রাম কাঁঠালবাড়িয়া তখনও বিদ্যুতের আলো দেখেনি। শহরের কথা শুনলে মনে হতো, সেখানে নাকি রাতেও দিন থাকে। অথচ এই গ্রামে সন্ধ্যা নামলেই অন্ধকার ধীরে ধীরে সবকিছু গিলে ফেলত। হারিকেন, লণ্ঠন আর চেরাগের আলোই ছিল রাতের একমাত্র ভরসা।
বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠের দাবদাহে টিনের ঘর যেন আগুন হয়ে উঠত। তখন রাতের খাবার শেষে সবাই মিলে উঠানে মাদুর পেতে শুয়ে পড়ত। মাথার ওপর অগণিত তারা, পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া শীতল বাতাস, দূরে কোথাও শিয়ালের দীর্ঘ ডাক, আর ঝিঁঝি পোকার অবিরাম সুর—সব মিলিয়ে প্রকৃতি যেন নিজেই এক বিশাল ঘুমপাড়ানি গান গেয়ে যেত।
মা আকাশের দিকে তাকিয়ে প্রায়ই বলতেন,
— “আল্লাহর বানানো এই আকাশের নিচে ঘুমের যে কী শান্তি, তা পাকা দালানে থেকেও পাওয়া যায় না।”
আলম মায়ের গা ঘেঁষে শুয়ে তারাগুলো গুনতে গুনতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়ত, সে নিজেও জানত না।
ভোরের সূর্য উঠতেই সেই উঠান আবার হয়ে উঠত সংসারের প্রাণকেন্দ্র। মাদুর বিছিয়ে সবাই একসঙ্গে বসে খেত গরম ভাত, পাতলা ডাল, আলুভর্তা আর ধোঁয়া ওঠা শুঁটকি ভাজা। খেতে খেতেই বাবা গ্রামের গল্প শোনাতেন—কার জমিতে এ বছর ধান ভালো হয়েছে, কার বাড়িতে নতুন অতিথি এসেছে, কোথায় বিয়ের আয়োজন চলছে।
সেসব গল্পের মধ্যে ছিল না কোনো রাজনীতি, ছিল না কোলাহল; ছিল কেবল মানুষ, মাটি আর পরস্পরের প্রতি অকৃত্রিম টান।
আজ এত বছর পর শহরের বহুতল ভবনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আলম যখন রাতের ঝলমলে বৈদ্যুতিক আলো দেখে, তখন হঠাৎই মনে হয়—হারিকেনের সেই কাঁপা আলোয় হয়তো আলো কম ছিল, কিন্তু মানুষের মুখগুলো ছিল অনেক বেশি উজ্জ্বল।
একদিন দুপুরে স্কুল থেকে ফিরে আলম দেখল, ডাকপিয়ন উঠান থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন। বাবার হাতে একটি খাম। খামের কোণায় বিদেশি ডাকটিকিট। মায়ের চোখে তখনই একরাশ আলো।
— “তোর মামার চিঠি!” বাবা মৃদু হেসে বললেন।
মুহূর্তেই খবরটা আশপাশে ছড়িয়ে পড়ল। সন্ধ্যা নামতেই কয়েকজন প্রতিবেশীও এসে বসলেন উঠানে। তখন একটি চিঠি ছিল শুধু একটি পরিবারের নয়, যেন পুরো গ্রামেরই খবর।
বাবা যত্ন করে খাম খুললেন। বহুদিনের পথ পেরিয়ে আসা কাগজটিতে তখনও যেন মরুভূমির গন্ধ লেগে আছে।
তিনি পড়তে শুরু করলেন—
“আমি ভালো আছি। তোমরা আমার জন্য দোয়া করো। আলম যেন মন দিয়ে পড়াশোনা করে। লেখাপড়াই ওর জীবনের সবচেয়ে বড় পুঁজি…”
মা চুপচাপ আঁচলের কোণ দিয়ে চোখ মুছলেন। বিদেশে থাকা আপনজনের খবর তখন এমনই ছিল—মাসের পর মাস অপেক্ষা, তারপর কয়েকটি লাইনে জমে থাকা অজস্র ভালোবাসা।
সেদিন চিঠির ভেতর থেকে আরেকটি জিনিস বের হলো। ছোট্ট একটি রঙিন ছবি।
মক্কার কাবা শরিফ।
মা দুই হাতে ছবিটি তুলে বুকে চেপে ধরলেন। অনেকক্ষণ কিছু বললেন না। তারপর খুব আস্তে বললেন,
— “আল্লাহ, জীবনে একবার যদি তোমার ঘরটা নিজের চোখে দেখতে পারতাম!”
ছোট্ট আলম মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তখন সে বুঝত না হজ কী, কাবার মাহাত্ম্যই বা কতখানি। শুধু বুঝেছিল—মায়ের এই ইচ্ছেটা খুব গভীর।
সেই ছবিটি পরে কাঠের আলমারির ভেতর কাপড়ে মুড়ে যত্ন করে রেখে দেওয়া হয়েছিল। ঈদের আগে বা বিশেষ কোনো দিনে মা সেটি বের করে আবার দেখতেন। যেন দূর দেশের একটি ছবি নয়, নিজের বুকের ভেতরের একটি স্বপ্ন।
শুক্রবার মানেই ছিল গঞ্জের দিন।
ভোর না হতেই বাবা কাঁধে গামছা ফেলে বেরিয়ে পড়তেন। আলমও সেদিন আনন্দে ঘুম থেকে লাফিয়ে উঠত।
গ্রাম ছাড়িয়ে মাটির পথ। বর্ষায় হাঁটুসমান কাদা, শুষ্ক মৌসুমে ধুলোর আস্তরণ। কোথাও কোথাও পথ এত সরু যে দুজন পাশাপাশি হাঁটারও জায়গা নেই।
একসময় সামনে পড়ত ছোট্ট একটি খাল।
খালের ওপর বাঁশের সাঁকো। সরু, দুলতে থাকা, নিচে সবুজাভ পানি।
আলম সাঁকোর মুখে দাঁড়িয়েই থমকে যেত।
বাবা হেসে বলতেন,
— “ভয় পাস না। আমার হাতটা শক্ত করে ধর।”
আলম বাবার শক্ত, রোদে পোড়া হাতটা আঁকড়ে ধরত। সেই হাতের মুঠোয় এমন এক নিরাপত্তা ছিল, যা পৃথিবীর আর কোথাও সে খুঁজে পায়নি।
বর্ষাকালে অবশ্য সাঁকো ডুবে যেত। তখন মাঝির নৌকাই ছিল ভরসা। দুই টাকা ভাড়া দিয়ে নৌকায় উঠে বসলে আলমের মনে হতো, যেন সে কোনো দূর দেশে যাচ্ছে।
খালের দুই ধারে কচুরিপানা, পানকৌড়ির ডুবসাঁতার, ধানক্ষেতের ওপর ভেসে বেড়ানো সাদা বক আর বাতাসে দুলতে থাকা কাশফুল—সব মিলিয়ে পথটাই যেন ছিল এক জীবন্ত ছবির বই।
গঞ্জে পৌঁছে বাবা সংসারের প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতেন—তেল, নুন, ডাল, কেরোসিন, কখনো মাছ, কখনো সবজি।
সব কেনাকাটা শেষে বাবার একটি কাজ কখনো বাদ পড়ত না।
তিনি মুচকি হেসে বলতেন,
— “আয়, এবার তোর পাওনাটা নেওয়া যাক।”
তারপর আলমের হাতে তুলে দিতেন দুটো কদমা কিংবা এক টুকরো শমপাপড়ি।
সেই সামান্য মিষ্টির স্বাদ আজও শহরের হাজার রকম দামি খাবারের চেয়ে অনেক বেশি মধুর মনে হয়।
ফেরার পথে গামছার দুই প্রান্তে বাঁধা বাজারের বোঝা কাঁধে নিয়ে বাবা ধীরে ধীরে হাঁটতেন। কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ত, কিন্তু মুখে থাকত তৃপ্তির হাসি।
আলম তখন বুঝত না—সংসারের বোঝা কত ভারী।
আজ বুঝতে পারে, সেই গামছায় বাঁধা ছিল শুধু বাজারের থলে নয়; ছিল একটি পরিবারের স্বপ্ন, সংগ্রাম আর ভালোবাসা।
শহরে যাওয়া তখন ছিল এক ধরনের উৎসব।
বছরে একবার, কখনো দুইবার—বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া শহরমুখো হওয়ার সুযোগ হতো না। চাচা শহরে থাকতেন। তাঁর কাছে বেড়াতে যাওয়ার খবর পেলেই আলমের আনন্দ আর ধরে না।
লঞ্চে ওঠার মুহূর্ত থেকেই তার মনে হতো, সে যেন নতুন এক পৃথিবীতে পা রেখেছে।
বিশাল নদীর বুক চিরে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলা লঞ্চ, দুই তীরে সারি সারি নারকেল, সুপারি আর কাশবন, কোথাও জেলেদের জাল ফেলা, কোথাও ছোট ছোট ডিঙি নৌকা—সব মিলিয়ে নদী যেন জীবন্ত এক মহাকাব্য।
আলমের সবচেয়ে প্রিয় জায়গা ছিল লঞ্চের ছাদ। সেখানে বসে বাতাসে চুল এলোমেলো করে দূরের আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে তার ভীষণ ভালো লাগত।
চা-ওয়ালা হাঁক দিত,
— “গরম চা… গরম চা…”
বাদামওয়ালা, চানাচুরওয়ালা, বিস্কুটওয়ালা একের পর এক এসে দাঁড়াত।
বাবা পকেট থেকে কয়েকটি ভাঁজ করা নোট বের করে এক প্যাকেট বিস্কুট কিনে আলমের হাতে দিয়ে বলতেন,
— “সব একসঙ্গে খেয়ে ফেলিস না। ফেরার পথেও খেতে ইচ্ছে করবে।”
আলম বিস্কুটে ছোট্ট কামড় বসিয়ে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকত। তার মনে হতো, পৃথিবীটা কত বিশাল, আর জীবন কত সুন্দর!
কিন্তু গ্রামের সবচেয়ে বড় আনন্দের নাম ছিল অন্য কিছু।
হাজী সাহেবের বাড়ির টেলিভিশন।
সেই সময় পুরো গ্রামে একমাত্র সাদা-কালো ব্যাটারিচালিত টেলিভিশন ছিল তাঁর বাড়িতে। শুক্রবার বিকেল হলেই খবর ছড়িয়ে পড়ত—
— “আজ বিটিভিতে সিনেমা আছে!”
মাগরিবের আগেই মানুষজন দলে দলে হাজী সাহেবের উঠানে জড়ো হতে শুরু করত।
কেউ চট বিছাত, কেউ মাদুর। শিশুরা সামনের সারিতে বসত। বয়স্করা একটু দূরে। নারীরা উঠানের এক পাশে পর্দার আড়াল রেখে বসতেন।
টেলিভিশনের ছোট্ট পর্দা জ্বলে উঠতেই পুরো উঠান নিস্তব্ধ হয়ে যেত।
সেই ছোট্ট সাদা-কালো পর্দায় যেন সবাই নিজের আনন্দ, দুঃখ আর স্বপ্ন খুঁজে পেত।
কখনো সিনেমা, কখনো নাটক, কখনো জাতীয় ক্রিকেট ম্যাচ।
বাংলাদেশের দল একটি উইকেট পেলেই পুরো উঠান একসঙ্গে গর্জে উঠত।
— “আলহামদুলিল্লাহ!”
কারও মুখে উচ্ছ্বাস, কারও হাততালি, কোথাও শিশুদের লাফিয়ে ওঠা—মুহূর্তেই মনে হতো, পুরো গ্রাম যেন এক পরিবারের নাম। জয়-পরাজয় তখন শুধু মাঠের ছিল না; আনন্দও ছিল সবার, উচ্ছ্বাসও ছিল সবার।
হাজী সাহেবও কখনো বিরক্ত হতেন না।
বরং হাসিমুখে বলতেন,
— “টেলিভিশন একা দেখে কী আনন্দ? আনন্দ তো সবার সঙ্গে ভাগ করে নিলেই বাড়ে।”
আজকের মতো তখন কারও হাতে মোবাইল ছিল না, ছিল না সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।
তবু মানুষ একে অন্যের অনেক বেশি কাছাকাছি ছিল।
হাজী সাহেবের সেই উঠান ছিল শুধু টেলিভিশন দেখার জায়গা নয়; ছিল গ্রামের অঘোষিত মিলনমেলা। সেখানে সুখ-দুঃখের গল্প হতো, নতুন ধানের খবর হতো, কার বাড়িতে বিয়ে, কার বাড়িতে অসুখ—সব খবরই এক উঠানে এসে মিলত।
এক সন্ধ্যায় স্কুল থেকে ফিরে আলম দেখল, বাবা চুপচাপ উঠানে বসে আছেন। হাতে আরেকটি চিঠি। মায়ের চোখ দুটো লাল।
আলমের বুক ধক করে উঠল।
— “কী হয়েছে, বাবা?”
বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
— “তোর মামা লিখেছে, এখনই দেশে ফিরতে পারবে না। আরও তিন বছর থাকতে হবে।”
কথাটা শুনে মায়ের চোখ বেয়ে নীরব অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
বছরের পর বছর ধরে ভাইকে দেখার অপেক্ষা যেন আরও দীর্ঘ হয়ে গেল।
কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর বাবা আবার চিঠির শেষ অংশ পড়লেন—
— “গ্রামে একটা টিউবওয়েল বসানোর টাকা পাঠাব। আর আলমের লেখাপড়ার খরচটাও আমি চালিয়ে নেব। ওকে পড়তে দিও।”
মা দু’হাত তুলে আকাশের দিকে তাকালেন।
— “আল্লাহ, আমার ভাইটার রিজিকে বরকত দিও। নিজের কষ্ট ভুলে সে আজও গ্রামের মানুষের কথা ভাবে।”
সেই রাতে আলম অনেকক্ষণ ঘুমোতে পারেনি।
হারিকেনের ক্ষীণ আলোয় সে চুপচাপ বই খুলে বসেছিল।
তার মনে হচ্ছিল, শুধু নিজের জন্য নয়—মা, বাবা, মামা আর পুরো গ্রামের স্বপ্ন নিয়েই তাকে বড় হতে হবে।
সময় থেমে থাকে না।
দেখতে দেখতে আলম ক্লাস টেনে উঠল। এসএসসি পরীক্ষায় ভালো ফল করল। খবরটা গ্রামে ছড়িয়ে পড়তেই বাবা সেদিন কাউকে কিছু না বলে মসজিদে গিয়ে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করলেন। মা সিজদায় মাথা রেখে অনেকক্ষণ কাঁদলেন—এ কান্না ছিল আনন্দের, কৃতজ্ঞতার।
কয়েক মাস পর প্রবাসী মামার পাঠানো টাকায় মহল্লার মাঝখানে একটি টিউবওয়েল বসানো হলো। উদ্বোধনের মতো কোনো আয়োজন ছিল না, তবু সেদিন যেন উৎসব নেমে এসেছিল। কল চেপে প্রথম যে স্বচ্ছ পানির ধারা বেরিয়ে এল, শিশুরা হাততালি দিয়ে উঠল। বৃদ্ধরা বললেন, “আলহামদুলিল্লাহ!” কেউ কলস ভরল, কেউ মুখ ধুয়ে নিল, কেউ দু’হাত তুলে দোয়া করল সেই মানুষটির জন্য, যিনি হাজার মাইল দূরে থেকেও গ্রামের তৃষ্ণার কথা ভুলে যাননি।
সেদিন আলম প্রথম অনুভব করল—মানুষ বড় হয় শুধু নিজের সাফল্যে নয়; অন্যের জীবনে সামান্য স্বস্তি এনে দিতে পারলেই তার জীবন সত্যিকার অর্থে বড় হয়ে ওঠে।
কয়েকদিন পর খবর এল, হাজী সাহেবের বাড়িতে রাতে বিশেষ নাটক দেখানো হবে।
মাগরিবের পর থেকেই মানুষ ভিড় করতে শুরু করল। উঠান আবার ভরে গেল পরিচিত মুখে। শিশুরা সামনের সারিতে, বড়রা পেছনে, নারীরা এক পাশে।
নাটকের গল্প ছিল এক গ্রাম্য ছেলেকে নিয়ে। পড়াশোনা করে সে শহরে প্রতিষ্ঠিত হয়, কিন্তু নিজের গ্রামকে ভুলে যায় না। ফিরে এসে মানুষের জন্য কাজ করে, গ্রামের উন্নয়নের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করে।
নাটক শেষ হওয়ার পর অনেকক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না।
নীরবতা ভাঙলেন গ্রামের এক প্রবীণ।
— “আমাদের গ্রামেও যদি এমন একটা ছেলে হতো!”
কথাটি যেন সোজা এসে আলমের বুকের ভেতর গিয়ে বাজল।
সে চুপচাপ আকাশের দিকে তাকাল। তারারাও যেন সেদিন একটু বেশি উজ্জ্বল ছিল।
মনে মনে সে প্রতিজ্ঞা করল—
যেখানেই থাকুক, যত দূরেই যাক, এই গ্রামকে কোনোদিন ভুলবে না।
বছর কেটে গেল।
গ্রামে বিদ্যুৎ এল। কাঁচা রাস্তা পাকা হলো। বাঁশের সাঁকোর জায়গায় তৈরি হলো কংক্রিটের সেতু। চিঠির অপেক্ষার দিন শেষ হয়ে মোবাইল ফোন মানুষের হাতের মুঠোয় চলে এল। হারিকেন, লণ্ঠন, চেরাগ—সব ধীরে ধীরে জায়গা করে নিল স্মৃতির আলমারিতে।
আজ আলম শহরে থাকে। কর্মব্যস্ত জীবনে দিনের পর দিন কেটে যায় দায়িত্ব, ব্যস্ততা আর সময়ের নিরন্তর ছুটে চলায়। তবু সুযোগ পেলেই সে ফিরে আসে শৈশবের সেই গ্রামে।
গ্রামের প্রবেশমুখে দাঁড়াতেই তার মনে হয়, সময় বদলেছে, কিন্তু মাটির গন্ধ বদলায়নি।
পাকা রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সে খুঁজে ফেরে কাদামাখা সেই মেঠোপথ। কংক্রিটের সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে মনে পড়ে বাবার হাত শক্ত করে ধরে বাঁশের সাঁকো পার হওয়ার কথা। বিদ্যুতের ঝলমলে আলোয় আলোকিত সন্ধ্যায়ও তার চোখ খুঁজে বেড়ায় হারিকেনের সেই কাঁপা শিখা। লঞ্চের শব্দ শুনলেই মনে পড়ে নদীর বুক চিরে ছুটে চলা সেই ভ্রমণ, বাবার হাতে কেনা এক প্যাকেট বিস্কুট, আর বাতাসে ভেসে থাকা কিশোর বয়সের নির্মল স্বপ্ন।
হাজী সাহেবের বাড়িটিও এখন বদলে গেছে। ঘরে ঘরে টেলিভিশন, হাতে হাতে স্মার্টফোন। কিন্তু সেই এক উঠানে শত মানুষের একসঙ্গে বসে হাসা, কাঁদা, হাততালি দেওয়া আর আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার দিনগুলো যেন সময়ের স্রোতে কোথায় হারিয়ে গেছে।
আজ খবর পৌঁছে যায় এক নিমিষে, অথচ মানুষ একে অন্যের খবর নিতে আগের মতো সময় বের করতে পারে না।
প্রযুক্তি মানুষকে কাছে এনেছে, কিন্তু কোথাও কোথাও হৃদয়ের দূরত্বও বাড়িয়ে দিয়েছে।
আলম প্রায়ই ভাবতে বসে—
হারিকেনের আলো হয়তো ক্ষীণ ছিল, কিন্তু মানুষের সম্পর্ক ছিল দীপ্ত।
চিঠি পৌঁছাতে হয়তো ছয় মাস লেগে যেত, কিন্তু অপেক্ষার প্রতিটি দিন ভালোবাসাকে আরও গভীর করত।
টেলিভিশন ছিল একটিই, অথচ আনন্দ ছিল সবার।
অভাব ছিল, কষ্ট ছিল, অনিশ্চয়তা ছিল—তবু মানুষ একে অন্যের পাশে দাঁড়াতে জানত, একে অন্যের সুখে হাসতে আর দুঃখে কাঁদতে জানত।
হয়তো সে কারণেই আজও কোনো কোনো রাতে চোখ বন্ধ করলে আলমের কানে ভেসে আসে ঝিঁঝি পোকার ডাক। মনে হয়, হারিকেনের শিখা দুলছে, উঠানে মাদুর পাতা, আকাশভরা তারা, আর মা স্নেহভরা কণ্ঠে ডাকছেন—
— “আলম, অনেক পড়েছিস বাবা… এবার ঘুমিয়ে পড়।”
আলম মৃদু হেসে ফেলে।
সে জানে, মানুষ আসলে সময়কে নয়, সময়ের মানুষগুলোকেই সবচেয়ে বেশি মনে রাখে।
ফেলে আসা দিনগুলো
আর কখনো ফিরে আসে না। কিন্তু তাদের আলো নিভে যায় না; তারা জ্বলতে থাকে স্মৃতির গভীরে, মানুষে মানুষে ভালোবাসার এক অনির্বাণ প্রদীপ হয়ে।
প্রাবন্ধিক, গল্পকার, ছড়াকার ও গীতিকবি
বাঞ্ছারামপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া
মেইল: shikderb95@gmail.com