মানবাধিকার নিয়ে আলোচনা হলেই আমাদের চোখের সামনে সাধারণত নারী, শিশু, শ্রমিক, সংখ্যালঘু বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চিত্র ভেসে ওঠে। কিন্তু এক শ্রেণির মানুষকে আমরা প্রায়ই ভুলে যাই – কারাবন্দি। সমাজে এমন একটি ধারণা প্রচলিত যে, কেউ কারাগারে গেলে সে যেন তার সকল অধিকার হারিয়ে ফেলে। অথচ মানবাধিকারের মৌলিক দর্শন ঠিক তার উল্টো কথাই বলে।
জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র (UDHR) ঘোষণা করে যে, সকল মানুষ স্বাধীনভাবে এবং সমান মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। এই “সকল মানুষ”-এর মধ্যে বন্দিরাও অন্তর্ভুক্ত। কারাদণ্ড একজন ব্যক্তির চলাফেরার স্বাধীনতা সীমিত করতে পারে, কিন্তু তার মানবিক মর্যাদা, জীবন, স্বাস্থ্য বা ন্যায়বিচারের অধিকার কেড়ে নিতে পারে না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বাংলাদেশের কারাগারগুলোর বাস্তবতা সেই নীতির সঙ্গে বহু ক্ষেত্রেই সাংঘর্ষিক।
২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে দেশের কারাগারগুলোতে বন্দির সংখ্যা ছিল প্রায় ৭৮ হাজার ৯০০ জন, যা কারাগারগুলোর অনুমোদিত ধারণক্ষমতার তুলনায় প্রায় ১৮৩ শতাংশ বেশি। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এই বন্দিদের প্রায় ৭৩ শতাংশই বিচারাধীন। অর্থাৎ তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, কিন্তু আদালত এখনো তাদের অপরাধী হিসেবে ঘোষণা করেনি। একজন মানুষ বছরের পর বছর কারাগারে থাকবেন অথচ তার বিচার সম্পন্ন হবে না , এটি শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং ন্যায়বিচারের ধারণার সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।
কারাগারে অতিরিক্ত ভিড় আজ মানবাধিকার সংকটের রূপ নিয়েছে। অনেক কারাগারে বন্দিদের জন্য পর্যাপ্ত থাকার জায়গা নেই, স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থা নেই, পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা নেই, এমনকি মানসিক স্বাস্থ্যসেবাও প্রায় অনুপস্থিত। ফলে অসুস্থতা, সহিংসতা, আত্মহত্যা এবং হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই দেশের বিভিন্ন কারাগারে অন্তত ৩৯ জন বন্দির মৃত্যুর তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ছিলেন বিচারাধীন বন্দি। প্রশ্ন হলো – যাদের অপরাধ এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি, তারা কেন এমন অমানবিক পরিস্থিতির শিকার হবেন?
বাংলাদেশের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিকের জীবন, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং নির্যাতন থেকে সুরক্ষার অধিকার নিশ্চিত করেছে। একইভাবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনও নিষ্ঠুর, অমানবিক ও অবমাননাকর আচরণকে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করে। তবুও কারাগারকে ঘিরে নির্যাতন, হেফাজতে সহিংসতা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ বারবার সামনে আসে। এসব ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত অধিকার লঙ্ঘনের বিষয় নয়; এগুলো রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে।
বিচারপ্রাপ্তির সুযোগের ক্ষেত্রেও বৈষম্য স্পষ্ট। অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল একজন অভিযুক্ত দ্রুত আইনি সহায়তা পেতে পারেন, জামিনের আবেদন করতে পারেন, দক্ষ আইনজীবী নিয়োগ করতে পারেন। কিন্তু দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অনেক মানুষ বছরের পর বছর বিচারাধীন অবস্থায় কারাগারে কাটিয়ে দেন। বিচার বিলম্বিত হওয়া মানেই অনেক ক্ষেত্রে বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়া। ফলে কারাগার ধীরে ধীরে অপরাধীদের সংশোধনের স্থান নয়, বরং বিচারব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার প্রতীক হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশের কারাব্যবস্থার আরেকটি বড় সমস্যা হলো আমাদের আইনি কাঠামোর পুরোনো রূপ। এখনও দেশের কারাগার পরিচালিত হয় মূলত ঔপনিবেশিক আমলের Prisons Act, 1894 এবং Prison Code, 1920-এর আলোকে। আধুনিক মানবাধিকার ধারণা, পুনর্বাসনকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে এসব আইনের সামঞ্জস্য প্রশ্নবিদ্ধ। অথচ জাতিসংঘের Nelson Mandela Rules স্পষ্টভাবে বলে যে, কারাগারের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত বন্দিদের মানবিক মর্যাদা রক্ষা করে তাদের সমাজে পুনর্বাসনের সুযোগ সৃষ্টি করা।
বাস্তবসম্মত সংস্কারের সময় এখনই। বিচারাধীন বন্দিদের মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি, কার্যকর আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা, কারাগারে স্বাস্থ্য ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, দক্ষতা উন্নয়ন ও পুনর্বাসন কর্মসূচি চালু করা এবং ক্ষুদ্র অপরাধে আটক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বিকল্প শাস্তির ব্যবস্থা বিবেচনা করা জরুরি। একই সঙ্গে শিশুদের জন্য আলাদা পুনর্বাসনমূলক ব্যবস্থা এবং নিয়মিত বিচারিক পর্যালোচনার মাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় আটক কমিয়ে আনা প্রয়োজন।
একটি সভ্য রাষ্ট্রকে বিচার করা যায় সে তার সবচেয়ে দুর্বল ও ক্ষমতাহীন নাগরিকদের সঙ্গে কেমন আচরণ করে তার ভিত্তিতে। কারাগারের দেয়ালের আড়ালে থাকা মানুষগুলো সমাজের চোখের আড়ালে থাকতে পারেন, কিন্তু তারা রাষ্ট্রের দায়িত্বের বাইরে নন। বন্দিদের অধিকার রক্ষা করা অপরাধকে প্রশ্রয় দেওয়া নয়; বরং আইনের শাসন, মানবিক মর্যাদা এবং ন্যায়বিচারের প্রতি রাষ্ট্রের অঙ্গীকারকে আরও দৃঢ় করা।
কারাগার যদি সংশোধনের পরিবর্তে মানবিক মর্যাদা ধ্বংসের স্থানে পরিণত হয়, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু বন্দিরা নয় ,ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো বিচারব্যবস্থা এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র নিজেই। তাই বন্দিদের মানবাধিকারকে বিলাসিতা নয়, ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র পরিচালনার অপরিহার্য শর্ত হিসেবে দেখার সময় এসেছে।
-জান্নাতুস শিরিয়া স্বচ্ছ
গণতন্ত্র চর্চা কেন্দ্র, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়