
বিশেষ প্রতিবেদক, ঢাকা:
ক্যান্টনমেন্ট সার্কেল ভূমি অফিসের সেবামূলক কার্যক্রম যখন সাধারণ মানুষের প্রশংসায় ভাসছে, ঠিক তখনই কিছু আকাঙ্ক্ষিত ও অপ্রীতিকর ঘটনা পুরো অর্জনকে ম্লান করে দিচ্ছে। সংবাদকর্মীদের মূল কাজ যেখানে অজানা ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্য জনগণের সামনে উপস্থাপন করা, সেখানে একশ্রেণীর ‘কথিত সাংবাদিক’ এখন চিহ্নিত দালালের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। তাদের মূল ব্যস্ততা এখন সেবাগ্রহীতাদের ফাইল আটকে তদবির বাণিজ্যে। এমন বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট চিত্র ও ভিডিও ফুটেজ সম্প্রতি প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।
সকাল থেকে রাত: ল্যান্ড অফিসে কথিত সাংবাদিকদের আস্তানা
অনুসন্ধানে জানা যায়, সরকারি এই ভূমি অফিসটিতে সকাল ৯টা থেকে শুরু করে অফিস ছুটির পর পর্যন্ত এসব ব্যক্তির আনাগোনা থাকে। তারা নিজেদের ‘মস্ত বড় সাংবাদিক’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে দিনভর বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরে বেড়ায়। তথাকথিত এই সাংবাদিকদের কর্মকাণ্ডে সাধারণ সেবাগ্রহীতারা যেমন বিভ্রান্ত হচ্ছেন, তেমনই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও প্রায়শই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ছেন।
নামে সাংবাদিক, কাজে নেই কোনো লেখা
অনুসন্ধানে আরও এক চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। বছরের পর বছর ধরে নিজেদের গণমাধ্যমকর্মী দাবি করলেও, আজ পর্যন্ত তাদের নামে কোনো পত্রিকায় বা গণমাধ্যমে একটি লাইনও প্রকাশিত হয়নি। এমনকি তারা কোন গণমাধ্যমে কাজ করেন, তারও কোনো বৈধ প্রমাণ বা আইডি কার্ডের সত্যতা মেলেনি। মূলত, সাংবাদিকতার সাইনবোর্ড ব্যবহার করে বিভিন্ন দপ্তরে প্রভাব খাটানো এবং দালালি করাই এদের মূল পেশা।
সিন্ডিকেটের আক্রমণাত্মক আচরণ:
ভূমি অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কাছে এই কথিত সাংবাদিকদের পরিচয় বা উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন করা হলে, তারা সংঘবদ্ধ হয়ে উত্তেজিত হয়ে ওঠেন এবং কর্মকর্তাদের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করেন।
নেপথ্যে যারা: ডাব ব্যবসায়ী থেকে সিকিউরিটি গার্ড!
অভিযুক্তদের অতীত ইতিহাস ও রহস্যময় কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখা যায়, এদের কারও সাথেই সাংবাদিকতার দূরতম কোনো সম্পর্ক বা অভিজ্ঞতা ছিল না। যেমন:
মিজান: আব্দুল্লাহপুরের সাবেক এক ডাব ব্যবসায়ী।
আলতাফ: মিরপুর এলাকার বাসিন্দা, যিনি পূর্বে একটি প্রতিষ্ঠানে সিকিউরিটি সুপারভাইজার হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
ফরিদ ও বৃষ্টি নদী ঝরনা: তাদের কর্মকাণ্ড ও চলাফেরা দীর্ঘদিন ধরেই স্থানীয়দের কাছে সন্দেহজনক ছিল।
কিছুদিন পূর্বে এই সিন্ডিকেটের সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড দেখে সাধারণ মানুষ ও কর্মকর্তারা তাদের কিছু প্রশ্ন করলে সত্যতা প্রকাশ পেয়ে যায়। তাৎক্ষণিকভাবে তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ডের উপস্থিতিতে ৬ জন কথিত সাংবাদিককে আটক করা হয়। পরবর্তীতে “ভবিষ্যতে কখনো এ ধরনের অপকর্মে লিপ্ত হবে না” মর্মে লিখিত মুচলেকা (দখেননামা) দিয়ে তারা সে যাত্রায় পার পেয়ে যায়।
সরকারি দপ্তরগুলো যেন ‘সোনার হরিণ’
শুধু ক্যান্টনমেন্ট সার্কেল ভূমি অফিসই নয়, দেশের বিভিন্ন সরকারি অধিদপ্তর ও গুরুত্বপূর্ণ ল্যান্ড অফিসগুলো এখন এই ধরনের নামসর্বস্ব ও বেনামী ভুঁইফোড় সাংবাদিকদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। সাধারণ মানুষের কাছে এই অফিসগুলো যেন একেকটি ‘সোনার হরিণ’, আর সেই হরিণ শিকারের নামে তদবির বাণিজ্য চালাচ্ছে এই চক্রটি।
সচেতন মহলের দাবি, সৎ ও পেশাদার সাংবাদিকদের ভাবমূর্তি রক্ষা এবং সরকারি সেবা প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ রাখতে অনতিবিলম্বে এই ‘ভুয়া সাংবাদিক ও দালাল সিন্ডিকেটের’ বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

