
আবুসুফিয়ান-সিরাজগঞ্জ
সিরাজগঞ্জ শহরের দরগা রোড এলাকায় প্রভাবশালীদের দাপটে পৌর ইমারত নির্মাণ আইন লঙ্ঘনের এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ সামনে এসেছে। আওয়ামী শাসনামলে সিরাজগঞ্জ পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের প্রভাব খাটিয়ে অনুমোদনের সীমা অতিক্রম করে এলিট টাওয়ার বহুতল ভবন নির্মাণ করা হলেও, দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে অভিযোগের পরও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় জনমনে ক্ষোভ ও উদ্বেগ বাড়ছে।
২১ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে সিরাজগঞ্জ পৌর প্রশাসক বরাবর দেওয়া সর্বশেষ লিখিত অভিযোগে বলা হয়, সিরাজগঞ্জ পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সাবেক স্টেনোটাইপিস্ট খাদেমুল ইসলাম ও কর্মরত হিসাবরক্ষক হেদায়েত উল্লাহ গং দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে এসপি অফিস ও পুলিশ বাহিনীর প্রভাব দেখিয়ে ৬ তলার অনুমোদন নিয়ে অবৈধভাবে ৮ তলা ভবন নির্মাণ করেছেন। শুধু তাই নয়, বর্তমানে ভবনটির ওপরের অংশে আরও সম্প্রসারণ কাজ চলমান রয়েছে, যা যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা সৃষ্টি করছে।
ভুক্তভোগী স্থানীয় বাসিন্দা ও দৈনিক স্বাধীন দেশ পত্রিকার বিশেষ প্রতিনিধি মো. আবুসুফিয়ান তালুকদার (সুফি) অভিযোগ করেন, পৌর ইমারত নির্মাণ আইনের নির্ধারিত সেটব্যাক রুলস সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে গা ঘেঁষে ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এতে অগ্নিকাণ্ড, ভূমিকম্পসহ যেকোনো দুর্যোগে ভয়াবহ বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন দপ্তরে ধারাবাহিকভাবে অভিযোগ দেওয়া হয়। ০২ মার্চ ২০২১ তারিখে পৌর মেয়র বরাবর, ২৮ অক্টোবর ২০২২ তারিখে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর, ০৮ নভেম্বর ২০২৩ তারিখে নগর পরিকল্পনাবিদ বরাবর, ১৪ জানুয়ারি ২০২৪ তারিখে উপ-পরিচালক, স্থানীয় সরকার ও জেলা প্রশাসক বরাবর, ০৮ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে পৌর প্রশাসক বরাবর এবং ২৪ জুন ২০২৫ তারিখে পরিবেশ অধিদপ্তর বরাবর লিখিত অভিযোগ দাখিল করা হয়। এছাড়া এপ্রিল ২০২২ সালের পৌর নগর পরিকল্পনা বিদ আনিসুর রহমানের তদন্ত প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে সেটব্যাক রুলস লঙ্ঘনের বিষয়টি উঠে আসে।
পরবর্তীতে ০৯ জুলাই ২০২৪ তারিখে শুধুমাত্র ৮ম তলা অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হলেও সচেতন মহলের মতে, পুরো ভবনটিই নকশাবহির্ভূত হওয়ায় আংশিক অপসারণ কোনোভাবেই যথেষ্ট নয়।
অভিযোগে আরও বলা হয়, নির্মাণকাজ চলাকালে ইট, বালু ও অন্যান্য সামগ্রী পড়ে ভুক্তভোগীর বাড়ির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং বসবাসের পরিবেশ মারাত্মকভাবে নষ্ট হয়েছে। প্রতিবাদ জানালে পরিবারকে বসতবাড়ি থেকে উচ্ছেদের হুমকি, প্রাণনাশ ও গুমের ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানির অভিযোগও রয়েছে।
এমনকি অভিযোগ রয়েছে, সিরাজগঞ্জ এসপি অফিসের হিসাবরক্ষক হেদায়েত উল্লাহ দরগা রোডের মুরুব্বি বদর উদ্দিন তালুকদারকে বলেন, সাংবাদিক আবুসুফিয়ানকে লেখালেখি বন্ধ করতে বলতে; অন্যথায় ‘এসপি স্যারকে’ বলে পুলিশি হয়রানির ব্যবস্থা করা হবে। বিষয়টি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নাগরিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, ভবনটির অনুমোদন পেতে ঢাকা ফায়ার সার্ভিসে ঘুষ লেনদেন হয়েছে বলে ভবন মালিক রজব আলীর স্বীকারোক্তি রয়েছে, যা পুরো ঘটনাকে আরও গুরুতর করে তুলেছে।
দীর্ঘদিনেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দ্রুত পুনঃতদন্ত করে নকশাবহির্ভূত অবৈধ অংশ সম্পূর্ণ অপসারণ, দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভুক্তভোগী পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক।
এদিকে স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—সিরাজগঞ্জ পৌরসভার অনুমোদন ছিল ৬ তলার, অথচ নির্মিত হয়েছে ৮ তলা ভবন। একাধিক অভিযোগ, তদন্ত প্রতিবেদন ও লিখিত আপত্তির পরও পৌর কর্তৃপক্ষ কার্যত নীরব কেন? আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘনের ঘটনায় দীর্ঘদিন ধরে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার পেছনে রহস্য কী?
সিরাজগঞ্জবাসীর একটাই প্রশ্ন—আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হবে, নাকি প্রভাবশালীদের দৌরাত্ম্যই চলতে থাকবে?

