
নিজস্ব প্রতিনিধি :
দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে দিন দিন বাড়ছে হতাশা ও ক্ষোভ। দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়া বহু নেতাকর্মী এখন নিজেদের অবমূল্যায়িত মনে করছেন। তাদের দাবি, রাজনৈতিক দুঃসময়ে রাজপথে থেকে মামলা-হামলা, নির্যাতন ও আর্থিক ক্ষতির বোঝা বহন করলেও বর্তমানে তারা কাঙ্ক্ষিত মূল্যায়ন পাচ্ছেন না।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, শুধু রাজধানী ঢাকাই নয়, দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা, থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়েও একই ধরনের চিত্র লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একসময় যারা দলের কর্মসূচির সামনের সারিতে ছিলেন, তাদের অনেকেই এখন রাজনীতি থেকে ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছেন।
লেখক ও গণমাধ্যমকর্মী মোঃ শিহাব উদ্দিন বলেন, দীর্ঘদিন দেশের বাইরে থাকার পর ২০২১ সালে দেশে ফিরে তিনি দেখেছেন, যেসব নেতাকর্মী আন্দোলন-সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন, তাদের অনেকেই আজ হতাশ ও উপেক্ষিত। তিনি মনে করেন, তাদের অবদান অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।
স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে গিয়ে অনেকেই ব্যক্তিগত সম্পদ বিক্রি করেছেন, মামলা-মোকদ্দমা ও বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। কেউ কেউ অর্থনৈতিকভাবে এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছেন যে, পরিবার চালানোও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ দলের সুবিধাভোগী অনেক নেতার কাছ থেকে তারা প্রত্যাশিত সহযোগিতা বা খোঁজখবর পাচ্ছেন না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তৃণমূলের এই হতাশা দীর্ঘস্থায়ী হলে ভবিষ্যতে সাংগঠনিক শক্তি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। কারণ, একটি রাজনৈতিক দলের মূল ভিত্তি হলো তার মাঠপর্যায়ের কর্মী ও সংগঠকরা। তাদের মনোবল ভেঙে গেলে দলীয় কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
অন্যদিকে, সাংবাদিকদের একটি অংশের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে। অনেক গণমাধ্যমকর্মীর দাবি, অতীতে ঝুঁকি নিয়ে কাজ করলেও বর্তমানে সত্য প্রকাশে তারা নানা ধরনের চাপ ও সংকোচের মুখোমুখি হচ্ছেন। সুশীল সমাজের একটি অংশ মনে করে, গণমাধ্যমকে স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করা হলে সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন অসঙ্গতি সহজেই সামনে আসতে পারে।
লেখকের মতে, মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র তুলে ধরতে সাংবাদিক সমাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ, এলাকাভিত্তিক নানা তথ্য ও জনমতের প্রতিফলন গণমাধ্যমের মাধ্যমে দ্রুত উঠে আসে, যা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এছাড়া দলের বিভিন্ন স্তরের কিছু নেতার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠছে বলেও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে। এসব অভিযোগের যথাযথ তদন্ত ও সাংগঠনিক মূল্যায়নের মাধ্যমে প্রকৃত ত্যাগী নেতাকর্মীদের সামনে আনার দাবি জানিয়েছেন অনেকেই। তাদের মতে, লোকদেখানো রাজনীতির পরিবর্তে যারা দীর্ঘদিন ধরে শ্রম, ত্যাগ ও মেধা দিয়ে দলকে এগিয়ে নিয়েছেন, তাদের যথাযথ সম্মান ও দায়িত্ব প্রদান করা জরুরি।
বিশ্লেষকদের অভিমত, তৃণমূলকে শক্তিশালী করতে হলে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের উচিত নিয়মিতভাবে থানা, ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় করা এবং তাদের বাস্তব সমস্যাগুলো শুনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। একই সঙ্গে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হলে দলীয় ঐক্য আরও সুদৃঢ় হবে।
রাজনৈতিক অঙ্গনের অনেকের বিশ্বাস, একটি দলের শক্তি নির্ভর করে তার তৃণমূলের ওপর। তাই ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন, সাংগঠনিক শুদ্ধি অভিযান এবং মাঠপর্যায়ে নতুন উদ্যম সৃষ্টির মাধ্যমে বিএনপি তার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পথচলাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
“তৃণমূলই একটি রাজনৈতিক দলের প্রাণশক্তি। তাদের হতাশা দূর করে নতুন উদ্যমে সংগঠিত করতে পারলেই আগামী দিনের রাজনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে”— এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

