
মোঃ তরিকুল ইসলাম খান :
মা নুরজাহান বেগম। সন্তানদের মানুষ করতে জীবনের সেরা সময়, শ্রম আর ভালোবাসা উজাড় করে দিয়েছিলেন। সেই সন্তানদের একজন সরকারের সচিব, একজন বুয়েটের অধ্যাপক, আরেকজন কানাডা প্রবাসী। জীবনের হিসেবে তারা সবাই প্রতিষ্ঠিত ও সফল।
কিন্তু এই সাফল্যের ভিড়ে মায়ের জন্য কতটুকু জায়গা ছিল—সে প্রশ্ন এখন জনমনে।
রাজধানীর মিরপুরের একটি ফ্ল্যাটের স্টোররুমের পাশের পরিত্যক্ত কক্ষ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে নুরজাহান বেগমের মরদেহ। ধারণা করা হচ্ছে, প্রায় ৮ দিন ধরে সেখানে পড়ে ছিল তাঁর নিথর দেহ। দরজায় কেউ কড়া নাড়েনি, কেউ খোঁজ নেয়নি—”মা, আপনি কেমন আছেন?”
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নুরজাহান বেগম দীর্ঘদিন ধরে ওই ফ্ল্যাটে একা বসবাস করতেন। তিন সন্তানই নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে ব্যস্ত। সচিব ছেলে সরকারি দায়িত্বে, অধ্যাপক ছেলে বুয়েটে, আর ছোট ছেলে পরিবার নিয়ে কানাডায় স্থায়ী। প্রতিবেশীরা জানান, গত কয়েকদিন ধরে ওই কক্ষ থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল। পরে পুলিশ এসে দরজা ভেঙে মরদেহ উদ্ধার করে।
মিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলেন, “প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে বার্ধক্যজনিত কারণে স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। তবে ময়নাতদন্তের পর বিস্তারিত বলা যাবে। আমরা সন্তানদের খবর দিয়েছি।”
এ ঘটনা শুধু একজন মায়ের মৃত্যুর খবর নয়, আমাদের সমাজের মানবিক অবক্ষয়ের এক বেদনাদায়ক চিত্র। যে মা সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দেন, নির্ঘুম রাত কাটান—তাঁর শেষ পরিণতি যদি হয় এমন নিঃসঙ্গতা, তাহলে আমাদের শিক্ষা, অর্জন ও সামাজিক মর্যাদার মূল্য কোথায়?
সমাজবিজ্ঞানী ড. রেহানা আক্তার বলেন, “আমরা এখন ক্যারিয়ার, বিদেশ, সামাজিক অবস্থান নিয়ে ব্যস্ত। কিন্তু মা-বাবার সঙ্গে পাঁচ মিনিট কথা বলার সময় বের করতে পারি না। তাদের প্রয়োজন সবসময় অর্থ নয়—একটি ফোনকল, একটু খোঁজখবর, সামান্য সময়ই তাদের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।”
নুরজাহান বেগমের মৃত্যু আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল—সন্তান যত বড়ই হোক, মা-বাবার হক আদায় না করলে সে প্রতিষ্ঠা অর্থহীন। সময় থাকতে মা-বাবাকে সময় দিন, ভালোবাসুন। কারণ এমন একটা দিন আসবে, যেদিন হাজার চাইলেও আর “মা” বলে ডাকার সুযোগ ফিরে পাবেন না।
মরহুমা নুরজাহান বেগমের নামাজে জানাজা শেষে মিরপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন এবং আমাদের সবাইকে মা-বাবার হক আদায়ের তাওফিক দান করুন।

