
সাকিব হাসান নাইম-ঘোড়াঘাট (দিনাজপুর)
উত্তরবঙ্গের ঐতিহাসিক জনপদ ঘোড়াঘাট একসময় ছিল প্রাচীন বাংলার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র। মোগল আমলে জেলা সদর হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চল ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক সমৃদ্ধ অধ্যায়ের সাক্ষী। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই গৌরবময় ঘোড়াঘাট আজ নানা সমস্যা ও অবহেলার কারণে পিছিয়ে পড়া একটি উপজেলায় পরিণত হয়েছে।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, মোগল শাসনামলে ঘোড়াঘাট ছিল প্রশাসনিক কার্যক্রম, রাজস্ব আদায় এবং সামরিক নিয়ন্ত্রণের অন্যতম কেন্দ্র। সে সময় এখানে গড়ে উঠেছিল গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক স্থাপনা, দুর্গ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। আজও উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্রাচীন দুর্গ, মসজিদ, রাজবাড়ি ও অন্যান্য স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ সেই অতীত ঐতিহ্যের স্মারক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
স্থানীয় ইতিহাসবিদদের মতে, মোগল সৈন্যদের ঘোড়ার বিশ্রাম ও রক্ষণাবেক্ষণের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল এ অঞ্চল। সেই সূত্র ধরেই এর নামকরণ হয় ‘ঘোড়াঘাট’। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে ধীরে ধীরে উন্নয়ন পরিকল্পনা ও প্রশাসনিক গুরুত্বের কেন্দ্রবিন্দু থেকে দূরে সরে যায় এই ঐতিহাসিক জনপদ।
বর্তমানে দিনাজপুর জেলা সদর থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ঘোড়াঘাট উপজেলা। জেলা শহর থেকে সড়কপথে এখানে পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় দুই থেকে তিন ঘণ্টা। ভৌগোলিক দূরত্বের পাশাপাশি উন্নয়ন বৈষম্যের কারণেও এলাকার মানুষ নানা ধরনের নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত বলে অভিযোগ রয়েছে।
উপজেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠান ঘোড়াঘাট থানা বর্তমানে জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ১৯১৬ সালে প্রায় ২ একর ২৭ শতাংশ জমির ওপর থানাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে ১৯৮৬ সালে ২১ লাখ ১৬ হাজার ৪০০ টাকা ব্যয়ে একটি ভবন নির্মাণ করা হলেও বর্তমানে ভবনের বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। ছাদের প্লাস্টার খসে পড়ছে, বর্ষাকালে ছাদ চুঁইয়ে পানি পড়া নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। কিছু পুলিশ সদস্যকে পলিথিন টানিয়ে থাকার ব্যবস্থাও করতে হয়। থানায় পর্যাপ্ত আবাসন সুবিধা না থাকায় পুলিশ সদস্যদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বিশেষ করে নারী পুলিশ সদস্যদের জন্য পৃথক কোয়ার্টার এবং এসআইদের জন্য আবাসন সুবিধারও অভাব রয়েছে।
আবাসন ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও ঘোড়াঘাট পিছিয়ে রয়েছে। উপজেলায় সরকারি বা বেসরকারি মানসম্পন্ন আবাসন সুবিধা নেই বললেই চলে। একমাত্র পুরোনো ডাকবাংলোটিও বর্তমানে জরাজীর্ণ ও প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। ফলে বিভিন্ন কাজে আগত অতিথি ও কর্মকর্তাদের আবাসন নিয়ে প্রায়ই সমস্যায় পড়তে হয়।
শিক্ষা ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। উপজেলায় প্রায় ৭০ থেকে ৮০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ২৫ থেকে ৩০টি মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং কয়েকটি ডিগ্রি কলেজ থাকলেও উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষার্থীদের অন্য জেলা বা বিভাগীয় শহরে যেতে হয়। স্থানীয়দের দাবি, উপজেলায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হলে শিক্ষার সুযোগ বাড়বে, নারী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পাবে এবং উচ্চশিক্ষার ব্যয় কমবে। একই সঙ্গে স্থানীয় অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অবকাঠামোগত উন্নয়নেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
এলাকার সচেতন নাগরিকদের মতে, ঘোড়াঘাট শুধু একটি উপজেলা নয়, এটি বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অথচ পর্যাপ্ত পরিকল্পনা ও উদ্যোগের অভাবে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব দিন দিন ম্লান হয়ে যাচ্ছে। তারা মনে করেন, প্রাচীন স্থাপনাগুলোর সংরক্ষণ, পর্যটন শিল্পের বিকাশ, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা হলে ঘোড়াঘাট আবারও অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে ফিরে আসতে পারে।
কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ঘোড়াঘাট আজও তার হারিয়ে যাওয়া গৌরবের গল্প বলে। এখন প্রয়োজন পরিকল্পিত উন্নয়ন, ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং সরকারের বিশেষ উদ্যোগ, যাতে ইতিহাসের এই জনপদ নতুন সম্ভাবনার পথে এগিয়ে যেতে পারে।

