
সৌভিক পোদ্দার, ঝিনাইদহ
ঘনিষ্ঠ ২ (দুই) বন্ধু একসঙ্গে আনন্দ ভ্রমণে গিয়েছিলেন কক্সবাজারে। পরিবারের সদস্যরা ভেবেছিলেন, ঘুরে এসে হয়তো নতুন গল্প শোনাবেন তাঁরা তাদের পরিবার কে। কিন্তু তাঁদের সেই সফরই হয়ে উঠল ২ (দুই)টি পরিবারের সারা জীবনের বিষাদ গাথা। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়ে লাশ হয়ে ফিরলেন বিজিবি সদস্য নাইমুর ইসলাম জিহাদ (২১) ও নাঈম মিয়া (২১)।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতির ফোর সিজন রেস্টুরেন্ট এলাকায় মারছা পরিবহনের দুটি যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত হন ৪ (চার)জন। তাঁদের মধ্যে ২ (দুই) জন ছিলেন ঝিনাইদহ সদর উপজেলার বাসিন্দা। নিহত নাইমুর ইসলাম জিহাদ বাজারগোপালপুর গ্রামের কৃষক চাঁন আলীর ছেলে এবং নাঈম মিয়া পোতাহাটি গ্রামের আনোয়ার খন্দকারের ছেলে।
নিহত বিজিবি সদস্য নাইমুর ইসলামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বারান্দার এক কোণে চৌকির ওপর নিথর হয়ে শুয়ে আছেন মা আমেনা খাতুন। ছেলের শোকে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। শরীরে চলছে স্যালাইন। পাশে বসে বাক্রুদ্ধ বাবা চাঁন আলী ছেলের ছবি হাতে স্মৃতি আঁকড়ে ধরে আছেন। বছর দুয়েক আগে অনেক কষ্ট করে ২ (দুই) কক্ষের একটি পাকা ঘর তুলেছেন চাঁন আলী। সেই ঘর এখনো প্লাস্টার করার সামর্থ্য হয়নি। এরই মধ্যে তাঁর ঘরে নেমে এল অমানিশার ঘোর অন্ধকার।
কাঁদতে কাঁদতে মা আমেনা খাতুন বলেন, ‘আমার ছেলে কত আনন্দ করে বন্ধুর সঙ্গে ঘুরতে গেল, আর ফিরল লাশ হয়ে। বড় ছেলে বিদেশে থাকে। ছোট ছেলেকে চাকরিতে পাঠিয়ে কত দুশ্চিন্তা করতাম, আবার গর্বও হতো। এখন আমার তরতাজা ছেলেকে কবরে রেখে আমি কীভাবে বাঁচব?’
বাবা চাঁন আলী বলেন, ‘অনেক কষ্ট করে বড় ছেলেকে বিদেশ পাঠিয়েছি। ছোট ছেলে লেখাপড়ায় ভালো ছিল। ঝিনাইদহ সরকারি কেসি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে নিজেই চেষ্টা করে বিজিবিতে চাকরি পেয়েছিল এক বছর হলো। চাকরি পাওয়ার পর মাত্র ২ (দুই) বার ছুটিতে বাড়ি এসেছে। দ্বিতীয়বার এসে বন্ধুর সঙ্গে কক্সবাজার ঘুরতে গেল, কিন্তু আর ফিরে এল না। ওই এলাকার বিজিবি সদস্যরা আমাকে ফোন দিয়ে আমার ছেলের মৃত্যুর সংবাদ জানায়। তারাই লাশ বাড়িতে নিয়ে এসে দাফন করে।’
একই রকম শোকের আবহ ঝিনাইদহ সদর উপজেলা পোতাহাটি গ্রামের নাঈম মিয়ার বাড়িতেও। পরিবারের একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে দিশেহারা মা গোলাপি খাতুন। বারবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন তিনি। ছোট্ট একটি চায়ের দোকান চালিয়ে সংসার চালাতেন বাবা আনোয়ার খন্দকার। একমাত্র ছেলেকে ঘিরেই ছিল তাঁদের সব আশা।
নিহত নাঈমের চাচা সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমি মরদেহ আনতে গিয়েছিলাম। রাত সাড়ে ১১ (এগারো টা ত্রিশ) টার দিকে দাফন করা হয়েছে। ভাই-ভাবীকে কিছুতেই শান্ত করতে পারছি না। একমাত্র ছেলেকে হারানোর কষ্ট তাঁরা মানতে পারছেন না।’ তিনি আরও বলেন, ঘাতক বাসের অজ্ঞাত চালক ও হেলপারের বিরুদ্ধে লোহাগাড়া থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।
লোহাগাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ জানান, নিহত নাঈমের চাচা বাদী হয়ে থানায় মামলা করেছেন। মামলাটি বর্তমানে হাইওয়ে পুলিশ তদন্ত করছে।

