উত্তরের মঙ্গাকবলিত জেলা গাইবান্ধা কয়েক দিনের টানা বিরূপ আবহাওয়ার কারণে দফায় দফায় বৃষ্টিতে বোরো ধানের জমিতে পানি জমেছে। জেলার ৭টি উপজেলার শতশত বিঘা জমির ধান এখন নিম্নাঞ্চলের পানির নিচে। পানির নিচে ধান তলিয়ে যাওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন এ অঞ্চলের চাষিরা।
কাঙ্ক্ষিত ফসল ঘরে তুলতে মরিয়া তারা। তবে শ্রমিক সংকট তৈরি হওয়ায় অতিরিক্ত টাকা দিয়েও সময় মতো ধান ঘরে তোলা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
কিছু কিছু জমিতে ধান বাতাসে নুয়ে পড়েছে। জমিতে পানি জমে থাকায় আধাপাকা ধান নষ্ট হওয়ার উপক্রম।
জেলার ৭টি উপজেলার, সদর, সুন্দরগঞ্জ, সাদুল্লাপুর, পলাশবাড়ী, গোবিন্দগঞ্জ, সাঘাটা, ফুলছড়ির বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে দেখা গেছে এমন চিত্র।
এবার ধানের ফসল উৎপাদন অনেকটা ভালো হলেও কয়েকদিনের বিরূপ আবহাওয়া নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় তাদের কাঙ্ক্ষিত ফসল ঘরে তুলতে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। চাষিরা আধা পাকা ধান কাটতে মরিয়া হয়ে পড়লেও শ্রমিক সংকট দিশেহারা অবস্থা। এসব এলাকায় শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না।
জেলার রাইতি নরাইল, নান্দিশহর বিল, মালিয়ানদহ, খামার নান্দিশহর, কুমরিশা বিল, পকুরিয়া বিল, মাঠেরবাজার, কুমারগাড়ি, সদর উপজেলার বাদিয়াখালি, চক বরুল, হরিনাবাড়ি, বেতকাপা, তুলশীঘাটসহ বিভিন্ন এলাকার নিম্নাঞ্চলের শতশত হেক্টর জমির আধাপাকা ধান পানির নিচে ডুবে আছে। অনেক কৃষক আধাপাকা ধান কাটছে।
সাদুল্লাপুর উপজেলার টুপামারী বিলের কয়েকজন ধান চাষি জানান, প্রায় ৫০০ বিঘা জমির ধান পানিতে ডুবে গেছে। এসব এলাকার ধান চাষিরা এনজিও থেকে টাকা নিয়ে ধান রোপণ করলেও নিজেদের খাদ্য সংকট নিয়ে ভোগান্তিতে পড়বেন বলে জানান তারা।
কৃষকরা জানান, অপরিকল্পিত ব্যবস্থায়ই এর জন্য দায়ী। সামান্য বৃষ্টি হলেই পানি জমে যাচ্ছে। আগে ছোট ছোট নালা-নদীগুলো দিয়ে পানি সহজেই নেমে যেত। পানি চলাচলের রাস্তা বন্ধ হওয়ায় সামান্য বৃষ্টি পানি জমে যাচ্ছে। কোন সরকারি তদারকি না থাকায় ভরাট হয়ে যাচ্ছে, সামনে বড়ো ধরনের সমস্যায় পড়তে হবে বলেও আশঙ্কা তাদের।
পলাশবাড়ী উপজেলার হরিনাবাড়ী গ্রামের সোলাগাড়ি বিলের কয়েকজন কৃষকের সাথে কথা বলে জানান গেছে, বিলে প্রায় শতশত বিঘা জমিতে ধান রয়েছে। গত ২ দিনের বৃষ্টি অনেক জমিতে পানি জমে গেছে। বিলের পানি নিষ্কাশনের জন্য নালা ছিল। কিন্তু কয়েক বছর আগে এখানে একটি ইটভাটা নির্মাণ করা হয়। ইটভাটার কারণে নালাটি বন্ধ। ফলে পানি নিষ্কাশনের আর কোন ব্যবস্থা না থাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।
কৃষকরা আরও জানান, পানি জমে যাওয়ায় বিঘাপ্রতি ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত মজুরি দিতে হচ্ছে কৃষকদের। তবুও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। ক্ষেত থেকে কেটে আনা ধানে পানি জমে আছে। শ্রমিক সংকটে বেশি দিন পানি জমায় ধান থেকে চারা বের হবে। রোদ নেই। এতে খরও পচে যাচ্ছে। সামনে গবাদিপশুর জন্য খাদ্য সংকট তৈরি হবে।
কৃষক সাজু মিয়া বলেন, বৈরী আবহাওয়া হলেও এবার ধান বেশ ভালো হয়েছিল। কিন্তু কয়েকদিনের বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা হয়ে পানির নিচে ডুবে আছে ধান। প্রায় ৪০ শত জমি পানিতে নুয়ে পড়েছে। আগে এক বিঘা জমি ধান কাটতে তিন/চার হাজার লাগত, সেখানে এখন সাত/আট হাজার টাকা বেশি লাগতেছে। টাকা দিয়েও শ্রমিক মিলছে না।
ইজিবাইক চালক রবিউল ইসলাম বলেন, কষ্টের ফসল চোখের সামনে জমিতে পানি পচে যাবে। ঋণ করে এসব জমিতে ধান লাগাইছি। যেটুকু ধান পাবো, তা দিয়ে ঋণ পরিশোধ করবো, না নিজের খাদ্য মেটাবো?
গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ আতিকুল ইসলাম মুঠোফোন বলেন, চলতি বছরে ৭টি উপজেলায় ১ লাখ ২৯ হাজার ২০ হেক্টর জমিতে বোরো (ইরি) ধান চাষ করা হয়েছে।
তবে কয়েকদিনের বৃষ্টির পানিতে ২১২ হেক্টর জমি আক্রান্ত হয়েছে। জমি থেকে পানি দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে। নতুন করে বৃষ্টি না হলে আক্রান্ত জমিগুলোর ক্ষতি হবে না। মাঠপর্যায়ে কৃষকদের ধান কাটার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।