
মোঃ তারিকুল ইসলাম খান :
সভ্য হওয়া মুখের কথায় সম্ভব নয়। পোশাক, অর্থ কিংবা উচ্চ শিক্ষার সনদ মানুষকে পুরোপুরি সভ্য বানাতে পারে না। সভ্যতা গড়ে ওঠে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের শিক্ষা, মূল্যবোধ এবং দায়িত্ববোধের মাধ্যমে। আর অসভ্য হওয়া? সেটা খুব সহজ। কারণ ভাঙতে সময় লাগে না, গড়তে লাগে যুগের পর যুগ।
একটি শিশুর প্রথম শিক্ষা শুরু হয় পরিবার থেকে। সেখানে যদি সম্মান, শিষ্টাচার, সহনশীলতা ও মানবিকতার চর্চা থাকে, তবে সে বড় হয়ে একজন ভদ্র ও সচেতন মানুষে পরিণত হয়। এরপর সমাজ তাকে শেখায় কিভাবে অন্যের অধিকারকে সম্মান করতে হয়, কিভাবে মতভেদ থাকলেও সৌজন্য বজায় রাখতে হয়। আর রাষ্ট্র তার জন্য তৈরি করে আইন, শিক্ষা ও নৈতিকতার পরিবেশ।
তাই পৃথিবীর উন্নত ও সভ্য দেশগুলো শুধু প্রযুক্তিতে এগিয়ে নয়, তারা আচরণ, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতার দিক থেকেও শক্তিশালী। সেখানকার মানুষ ট্রাফিক আইন মানে, অন্যের অধিকারকে সম্মান করে, প্রকাশ্যে শৃঙ্খলা বজায় রাখে। এ কারণেই বিশ্বের অনেক মানুষ সেই দেশগুলোতে পড়াশোনা করতে যেতে চায়। তারা শুধু ডিগ্রি অর্জন করতে নয়, বরং একটি সভ্য পরিবেশে নিজেকে গড়ে তুলতে চায়।
কিন্তু বাস্তবতার আরেকটি দিকও আছে। অনেক সময় কিছু মানুষ উন্নত দেশে গিয়ে শিক্ষা, সুযোগ ও অর্থ অর্জন করলেও নিজের ভেতরের অসভ্য আচরণ পরিবর্তন করতে পারে না। আবার কেউ কেউ সভ্য সমাজে থেকে শিখে আসে কিভাবে মানুষকে সম্মান দিতে হয়, কিভাবে সমাজকে সুন্দর রাখতে হয়। এরপর তারা নিজের দেশেও সেই শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে চায়।
দুঃখজনক হলেও সত্য, কিছু মানুষ বিদেশে গিয়ে নিজেকে পরিবর্তন না করে উল্টো সুযোগ পেলেই দায়িত্বহীন আচরণে ফিরে যায়। ফলে প্রশ্ন জাগে—সভ্যতা কি শুধু দেশের কারণে আসে, নাকি ব্যক্তির মন-মানসিকতার কারণেও আসে? আসলে দুটোই গুরুত্বপূর্ণ। ভালো পরিবার, সুন্দর সমাজ ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্র মানুষকে সভ্য হওয়ার পথ দেখায়, কিন্তু সেই পথ ধরে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিতে হয় নিজেকেই।
আজ আমাদের সমাজে শিক্ষিত মানুষের অভাব নেই, কিন্তু প্রকৃত ভদ্র ও মানবিক মানুষের অভাব অনুভূত হয় অনেক জায়গায়। কারণ শিক্ষা শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; তা আচরণে, কথাবার্তায় এবং দায়িত্ববোধে প্রকাশ পেতে হবে।
সভ্য সমাজ গড়তে হলে আমাদের পরিবার থেকে শুরু করতে হবে। সন্তানকে শুধু পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার শিক্ষা নয়, মানুষকে সম্মান করা, সত্য কথা বলা এবং দায়িত্বশীল হওয়ার শিক্ষাও দিতে হবে। সমাজকে হতে হবে সহনশীল ও ন্যায়ভিত্তিক। আর রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে এমন পরিবেশ, যেখানে সততা ও মানবিকতা মূল্য পায়।
শেষ কথা হলো—অসভ্য হওয়া সহজ, কিন্তু সভ্য হওয়া বড় কঠিন। কারণ সভ্যতা শুধু বাহ্যিক নয়, এটি মানুষের চরিত্র, চিন্তা ও বিবেকের পরিচয়। তাই ডিগ্রির পাশাপাশি আমাদের প্রয়োজন মানবিকতা ও শিষ্টাচারের শিক্ষা। তবেই গড়ে উঠবে সত্যিকারের সুন্দর ও সভ্য সমাজ।

