
সাধন সাহা জয়-ব্রাহ্মণবাড়িয়া
দুপুরের সূর্য তখন ঠিক মাথার ওপর। প্রখর উত্তাপে জনজীবন ওষ্ঠাগত। রাস্তাঘাটে মানুষের আনাগোনা কমে এলেও বিরাম নেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার ভোলাচং গ্রামের পালপাড়ায়। সামনেই বাংলা নববর্ষ। আর এই বৈশাখী মেলাকে কেন্দ্র করেই এখন নাওয়া-খাওয়া ভুলে ব্যস্ত সময় পার করছেন স্থানীয় মৃৎশিল্পীরা।
পালপাড়ায় ঢুকতেই চোখে পড়ে এক শৈল্পিক কর্মযজ্ঞ। কারো উঠানজুড়ে শুকানো হচ্ছে কাদা মাটির হাতি, ঘোড়া, পুতুল কিংবা মাটির ব্যাংক; আবার কোথাও চলছে নিপুণ হাতে রঙের কাজ। এক কোণে বসে নিবিষ্ট মনে চাকা ঘুরিয়ে মাটির তালের অবয়ব দিচ্ছিলেন কারিগর লনী পাল। ঘাম মুছতে মুছতে তিনি বলেন, “আজকার গরমডা একটু বেশি অই। গেনজিডা খুইল্লা অই বসি। মেলায় টবের চাহিদা থাকে অনেক, তাই এগুলাই বেশি বানাচ্ছি।”
পাশেই দেখা গেল একদল নারী কারিগরকে। তাদের তুলির ছোঁয়ায় মাটির নিস্প্রাণ পুতুল আর হাতি-ঘোড়াগুলো যেন প্রাণ ফিরে পাচ্ছে। মায়েদের এই ব্যস্ততা আর মাটির ঘ্রাণের মাঝেই খেলাধুলা করছে ছোট ছোট শিশুরা। তাদের কাছে এই উঠানটিই যেন এক জীবন্ত কর্মশালা। বৈশাখী মেলায় শিশুদের প্রধান আকর্ষণই থাকে এসব মাটির খেলনা। ভোলাচংয়ের এই খেলনাগুলোই পাইকারদের মাধ্যমে পৌঁছে যাবে জেলার আনাচে-কানাচে।
আনন্দ আর ব্যস্ততার আড়ালে পালপাড়ার মৃৎশিল্পীদের মনে রয়েছে বিষাদের ছায়াও। কাঁচামালের আকাশচুম্বী দাম আর বাজারে প্লাস্টিকের খেলনার দাপট তাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। কারিগর অধীর পাল বলেন, “অনেক কষ্ট করে খেলনাগুলো বানাচ্ছি। বৈশাখী মেলায় এগুলোর চাহিদা বেশি থাকে বলে এখনো টিকে আছি। অনেক পাইকারও এখান থেকে মাল নিয়ে যায়।”
বাপ-দাদার এই আদি পেশাকে ভালোবেসে আজও আঁকড়ে ধরে আছেন পালপাড়ার কারিগররা। তবে তারা মনে করেন, যথাযথ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও ঋণের সুবিধা না পেলে প্লাস্টিকের ভিড়ে একদিন হয়তো এই মাটির শিল্প হারিয়ে যাবে।
মাটির গন্ধ আর শিল্পীর ঘামে তৈরি এই রঙিন খেলনাগুলোই এখন সাজিয়ে তোলার অপেক্ষায় আছে আসন্ন বৈশাখী মেলাকে। নবীনগরের পালপাড়ার বাসিন্দাদের প্রত্যাশা—পুরানো বছরের সব ক্লান্তি মুছে নতুন বছর তাদের মুখে হাসি ফোটাবে।

