
নিজস্ব প্রতিনিধি :
আজ শহীদ জোহা দিবস। ২০০২ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ও সাংস্কৃতিক কর্মী থাকা কালে তৎকালিন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক জোট প্রতিবছের ন্যায় সেবার ও জোহা দিবস তথা শিক্ষক দিবসে শহীদ শামসুজ্জোহা স্যারকে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ কে শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
আমরা পুর্বের রাতে ফুল নিয়ে তোড়া বানাতাম। আমি হামিদুল হক সুমন ও জোট সাধারণ সম্পাদক জোহা ভাই মিলে রাবি প্রশাসন ভবনের সামনে অর্থাৎ জোহা স্যারের কবরের সামনেই ফুল সংগ্রহ করতে গেছি।
নাইট গার্ড হঠাৎ চিৎকার। আমরা তিন জন গার্ডকে জোহা স্যারের কবরের দেওয়াল ঘেঁষে লুকালাম বা পালালাম।
গার্ড আবারও চিৎকার ওখানে কে?
আমাদের জোহা ভাই( বর্তমানে প্রথম আলোতে কর্মরত) নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলে উঠলো ” আমি জোহা “।
আবৃত্তি করতেন বলে উনার কণ্ঠ ভরাট। এবং দ্বিতীয় বার ও বলে উঠলেন “আমি জোহা “।
গার্ড এবার ভয় পেলে তার শরীরের সকল শক্তি দিয়ে পালালো।
আমরা ফুল নিয়ে চলে এলাম। এমন ই সময় রাত একটা থেকে দেড়টা হবে। পরে আমি খোঁজ নিয়ে জানতে পারি গার্ড ছিল খলিল ভাই, বাড়ী মেহেরচণ্ডি। তিনি আমাকে বলেছিলেন গতকাল জোহা স্যার এসেছিল মামা ( রাজশাহীর ভাষায়)
আমার ও হাসি লেগেছিল।
কিন্তু তার শেষ কথা গুলো আজও কানে বাজে ” মামা সত্যি সত্যি যদি জোহা স্যারের মত মানুষ আসতো তাহলে ক্যাম্পাস আরও ভালো হত “।
আজ শিক্ষকগন রাজনীতি করেন সরকারের অনুকম্পায় ডিসি হন,কেউ তো মন্ত্রী হয়ে দেশের… কেউ শাড়ীর আঁচল তলে রাজনৈতিক দলকে আঁকড়ে রাখে কিন্তু আমাদের জোহা স্বাধীনতার জোহা স্যার রা মরে না চেতনা জ্বালানি হিসাবে বাববার ফিরে আসে। যুগে যুগে সেই জালানিতেই জ্বলে সংগ্রামের আগুন কিম্বা শোনা যায় আগুন ঝরা দিনের উত্তাল ডাক । বলছিলাম ৬৯ এর গনঅভ্যুত্থানে শহীদ শ্রদ্ধেয় শিক্ষক
সৈয়দ মুহম্মদ শামসুজ্জোহার কথা তিনি জন্মেছিলেন মে ১, ১৯৩৪ সালে পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলায়।
দেশবিভাগের পর ১৯৫০ সালের প্রথমদিকে পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হলে শামসুজ্জোহা তার পরিবার নিয়ে পূর্ব বাংলায় চলে আসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগে স্নাতকে ভর্তি হন। এসময় ভাষা আন্দোলনের সাথে তিনি প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৫৩ সালে দ্বিতীয় শ্রেনীতে স্নাতক সম্পন্ন করার পর তিনি রসায়নবিদ ড. মোকাররম হোসেন খন্দকারের তত্ত্বাবধানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রীর জন্য গবেষণা শুরু করেন। গবেষণার বিষয় ছিলো বৈদ্যুতিক পদ্ধতিতে ক্রোমাইট খনিজের জারণ প্রক্রিয়া, যা পরবর্তীকালে ১৯৫৪ সালে লন্ডনের রসায়ন শিল্প পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ১৯৫৪ সালে তিনি স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত তিনি লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজ অব সায়েন্স, টেকনোলজিতে অ্যান্ড মেডিসিনে অধ্যয়ন করেন এবং লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় হতে বিএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬১ সালে রয়্যাল অর্ডিনেন্স থেকে ইস্তফা নিয়ে জোহা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ডেভেলপমেন্ট অফিসার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন এবং একই বছর উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের লেকচারার পদে যোগদান করেন। সেখানে অধ্যাপনাকালে তিনি বৃত্তি নিয়ে পুনরায় লন্ডন ইম্পেরিয়াল কলেজে চলে যান।পিএইচডি ও ডিআইসি ডিগ্রি লাভ করে তিনি ১৯৬৪ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে এসে পুনরায় শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৯৬৬ সালে তাকে রিডার পদে উন্নীত করা হয়। পরবর্তীবছর ১৯৬৫ সালে তিনি শাহ মখদুম হলের আবাসিক শিক্ষক এবং ১৯৬৬ সালে প্রাধ্যক্ষ পদে নিযুক্ত হন। লন্ডনে গবেষণা কালে তিনি কিছুকাল বেরেট স্ট্রিট ওয়েস্ট লন্ডন কমার্স কলেজে শিক্ষকতা করেন। ১৯৬৮ সালে নরওয়ের অসলোবিশ্ববিদ্যালয়
থেকে এক বছর মেয়াদী বৃত্তি পেলেও বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিজ্ঞ শিক্ষক না থাজাই তিনি যাননি ।১৯৬৯ সালে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ ১৯৬৬-এর ছয় দফা ও ১১ দফা দাবিতে এবং শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে আনিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলন গড়ে তোলে। ২০ জানুয়ারি পাকিস্তানি পুলিশের গুলিতে মিছিল করা অবস্থায় ছাত্র ইউনিয়নের নেতা আমানুল্লাহ আসাদুজ্জামান শহীদ হন। ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা সেনানিবাসে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হককে
হত্যা করা হয়।
এই দুটি হত্যাকাণ্ডে আন্দোলন আরও বেগবান হয়ে ওঠে এবং উদ্ভূত পরিস্থিতি প্রাদেশিক সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। কেন্দ্রীয় সরকার সামরিক বাহিনীর মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে, সান্ধ্যকালীন আইন জারি করে। ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল করার চেষ্টা করে। আন্দোলনকারী ছাত্ররা মিছিল বের করলে অনেক ছাত্রের জীবননাশের আশঙ্কা থাকায় প্রক্টর শামসুজ্জোহা নিজের পরিচয় দিয়েছিলেন সেনাসদস্যদের। কিন্তু সেনাসদস্যরা দ্বারা ছোড়া গুলিতে বিদ্ধ হয় ও পরবর্তীতে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে তাকে হত্যা করা হয় ।
জোহার মৃত্যু তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের ভীত নাড়িয়ে দিয়েছিলো এবং প্রভাব ছিলো সূদূরপ্রসারী, যা দেশকে স্বাধীন করতে অন্যতম ভূমিকা পালন করেছিলো। দেশ স্বাধীনের পর তার অবদানের কৃতজ্ঞতাস্বরুপ তাকে শহীদ বুদ্ধিজীবির সম্মানে ভূষিত করা হয়। তার মৃত্যুর পরপরই তৎকালীন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তার নামানুসারে নবনির্মিত আবাসিক হলের নামকরণ করেন “শহীদ শামসুজ্জোহা হল”।
নাটোরে তার নামে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়। এছাড়াও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগ প্রতিবছর জোহা সিম্পজিয়াম পালন করা হয়ে থাকে। সম্প্রতি দেশের শিক্ষকসমাজ জোহার মৃত্যুদিবসকে “জাতীয় শিক্ষক দিবস” হিসেবে পালনের দাবী জানিয়ে আসছে। তার নামানুসারে নির্মিত আবাসিক হলশহীদ শামসুজ্জোহা হলের মূল ফটকের পাশে একটি স্মৃতি স্মারক স্ফুলিঙ্গ নির্মাণ করা হয় ২০১২ সালে।
শহীদ আবু সাঈদ ২০২৪ সালের গুলিতে ১৬ জুলাই নিহত হোন। তিনি আন্দোলনকে বেগবান করতে ১৫ জুলাই ২০২৪ শামসুজ্জোহা স্যারকে উল্লেখ ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন,
“স্যার (মোহাম্মদ শামসুজ্জোহা)! এই মুহূর্তে আপনাকে ভীষণ দরকার স্যার! আপনার সমসাময়িক সময়ে যারা ছিলো সবাই তো মরে গিয়েছে। কিন্তু আপনি মরেও অমর। আপনার সমাধি আমাদের প্রেরণা। আপনার চেতনায় আমরা উদ্ভাসিত।
আপনারাও প্রকৃতির নিয়মে একসময় মারা যাবেন। কিন্তু যতদিন বেচেঁ আছেন মেরুদণ্ড নিয়ে বাচুঁন। নায্য দাবিকে সমর্থন জানান, রাস্তায় নামুন, শিক্ষার্থীদের ঢাল হয়ে দাড়াঁন। প্রকৃত সম্মান এবং শ্রদ্ধা পাবেন। মৃত্যুর সাথে সাথেই কালের গর্ভে হারিয়ে যাবেন না। আজন্ম বেচেঁ থাকবেন শামসুজ্জোহা হয়ে।
শরীফ মোঃ বেদুইন হায়দার লিও
সাবেক সাংস্কৃতিক কর্মী
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

