
নিজস্ব প্রতিনিধি :
বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে জোট কোনো নতুন ধারণা নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই বড় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ছোট দলগুলোর সমঝোতা, আসন ভাগাভাগি কিংবা নির্বাচনী বোঝাপড়ার নজির রয়েছে। তবে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে যে রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, তা আগের সব অভিজ্ঞতাকেই যেন ছাপিয়ে গেছে। এবার জোট রাজনীতি আর শুধু রাজনৈতিক সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি রূপ নিয়েছে দল ভাঙা, দল বিলুপ্তি এবং আদর্শ বিসর্জনের এক প্রকাশ্য প্রতিযোগিতায়।
নির্বাচন কমিশনের গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধনের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে যে ঢেউ উঠেছে, তার সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে ছোট ও মাঝারি রাজনৈতিক দলগুলো। আগে জোটের শরিকরা বড় দলের প্রতীকে নির্বাচন করার সুযোগ পেলেও সেই পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন ছোট দলগুলোর সামনে কার্যত দুটি বিকল্পই খোলা- নিজস্ব প্রতীকে নির্বাচন করে নিশ্চিত পরাজয়ের ঝুঁকি নেওয়া, অথবা দল ভেঙে কিংবা বিলুপ্ত করে বড় দলে মিশে যাওয়া। বাস্তবে অধিকাংশ দলই দ্বিতীয় পথটিই বেছে নিচ্ছে।
গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খানের বিএনপিতে যোগ দেওয়া এবং সঙ্গে সঙ্গে ধানের শীষ প্রতীকে মনোনয়ন পাওয়া এই প্রবণতার সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ। ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে উঠে আসা এই নেতা একসময় নতুন ধারার রাজনীতির কথা বলেছিলেন। অথচ আজ তিনি নিজ দল ছেড়ে বড় দলে যোগ দিতে বাধ্য হচ্ছেন কেবল নির্বাচনী বাস্তবতার কারণে। তার বক্তব্যেও বিষয়টি স্পষ্ট- বাংলাদেশে নির্বাচন জিততে হলে প্রতীকই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর।
এ এক ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের গল্প নয়; এটি একটি কাঠামোগত সংকটের প্রতিফলন। এলডিপি, বিএলডিপি, জাতীয় দলসহ একাধিক রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা ইতিমধ্যে নিজেদের দল বিলুপ্ত করে কিংবা পদত্যাগ করে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। এর পেছনে যুক্তি হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে ‘বাস্তবতা’, ‘কৌশল’ কিংবা ‘ভোটের অঙ্ক’। কিন্তু প্রশ্ন হলো- রাজনীতি কি তবে শুধুই অঙ্কের খেলা? আদর্শ, কর্মসূচি ও রাজনৈতিক পরিচয়ের কি আর কোনো মূল্য নেই?
এবারের নির্বাচনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ যুক্ত হয়েছে- উচ্চকক্ষ বা সংসদের দ্বিতীয় কক্ষ। নিম্নকক্ষের ভোটের হারের ভিত্তিতে উচ্চকক্ষ গঠিত হওয়ার বিষয়টি ছোট দলগুলোর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে। ভিন্ন ভিন্ন প্রতীকে নির্বাচন করলে উচ্চকক্ষে আসন পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ- এই যুক্তিতে অনেক দলই বড় দলের প্রতীকের নিচে আশ্রয় নিতে চাইছে। এতে স্বল্পমেয়াদে কিছু রাজনৈতিক লাভ হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর পরিণতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
কারণ, যখন একটি রাজনৈতিক দল তার নিজস্ব প্রতীক, নাম ও সংগঠন বিলুপ্ত করে দেয়, তখন শুধু একটি নির্বাচন নয়- একটি রাজনৈতিক সম্ভাবনাও শেষ হয়ে যায়। সংসদে একজন বা দুজন সদস্য পাঠানো হয়তো সম্ভব হয়, কিন্তু ভবিষ্যতে স্বাধীনভাবে রাজনীতি করার সক্ষমতা আর থাকে না। ইতিহাস বলে, এভাবে বড় দলে বিলীন হয়ে যাওয়া দলগুলো খুব কম ক্ষেত্রেই আবার ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছে।
এই প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক কে এম মহিউদ্দিনের মন্তব্য বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, ছোট দলগুলো যখন বড় দলের সঙ্গে মিশে যায়, তখন তারা কেবল ক্ষমতাকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে এবং ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলে নিজস্ব আদর্শ ও কর্মসূচি। এটি শুধু ছোট দলগুলোর সমস্যা নয়; এটি পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্য একটি অশনিসংকেত।
তবে সব দল যে এই স্রোতে গা ভাসাচ্ছে, তা নয়। গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর নিজ দলের প্রতীকেই নির্বাচনে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। গণসংহতি আন্দোলন, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির মতো দলগুলোও নিজেদের প্রতীক ধরে রাখার কথা বলছে। এসব সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক সাহসের পরিচয়। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়- এই সাহস কি ভোটের রাজনীতিতে টিকে থাকার জন্য যথেষ্ট?
বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভোটারদের বড় একটি অংশ এখনও ব্যক্তি বা কর্মসূচির চেয়ে প্রতীকের ওপর বেশি নির্ভরশীল। দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার পালাবদল মূলত দুটি বড় দলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকায় ভোটারদের মনস্তত্ত্বেও একটি দ্বিদলীয় কাঠামো গড়ে উঠেছে। এর বাইরে থাকা দলগুলোর জন্য জায়গা করে নেওয়া দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে।
এই পরিস্থিতির দায় শুধু ছোট দলগুলোর কাঁধে চাপানো যায় না। নির্বাচনব্যবস্থা, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং ক্ষমতার কাঠামো- সব মিলিয়েই এই সংকট তৈরি হয়েছে। বড় দলগুলোরও দায়িত্ব ছিল শরিক দলগুলোর রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, জোটের নামে ছোট দলগুলোকে নিজেদের মধ্যে শুষে নেওয়ার প্রবণতাই বেশি।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো- এই ধারায় বহুদলীয় গণতন্ত্র কোথায় দাঁড়াবে? গণতন্ত্রের সৌন্দর্য বৈচিত্র্যে, ভিন্নমতে ও বিকল্প চিন্তায়। যদি প্রতিবার নির্বাচনে টিকে থাকার জন্য নতুন দলগুলোকে বড় দলে বিলীন হয়ে যেতে হয়, তাহলে ভবিষ্যতে নতুন রাজনৈতিক শক্তির বিকাশ কীভাবে হবে?
আজ যারা দল ভেঙে বড় দলে যোগ দিচ্ছেন, তারা হয়তো এই নির্বাচনে জয়ী হবেন। কিন্তু পাঁচ বা দশ বছর পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে কি তাদের কোনো স্বতন্ত্র অবস্থান থাকবে? নাকি তারা কেবল বড় দলের ভেতরে হারিয়ে যাবেন আরও অনেকের মতো?
বাংলাদেশের রাজনীতিতে দল গঠন যত সহজ, দল বিলুপ্তিও যেন ততটাই সহজ হয়ে উঠেছে। এই প্রবণতা চলতে থাকলে রাজনীতি ক্রমেই আদর্শহীন, ক্ষমতানির্ভর ও সংকীর্ণ হয়ে পড়বে। সংসদে যাওয়াই যদি রাজনীতির একমাত্র লক্ষ্য হয়, তাহলে জনগণের প্রতিনিধিত্ব, নীতি-আদর্শ ও দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রচিন্তা সবই গৌণ হয়ে যাবে।
এই নির্বাচন তাই শুধু সরকার গঠন বা ক্ষমতার প্রশ্ন নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতেরও একটি পরীক্ষা। প্রতীকের রাজনীতি কি শেষ পর্যন্ত আদর্শের রাজনীতিকে গ্রাস করবে, নাকি এই সংকট থেকেই একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্ম হবে- সে উত্তর সময়ই দেবে। তবে এখনই যদি আমরা এই প্রবণতা নিয়ে প্রশ্ন না তুলি, তাহলে ভবিষ্যতে হয়তো প্রশ্ন তোলার মতো রাজনৈতিক শক্তিই আর অবশিষ্ট থাকবে না।

