
মোঃ জাহিদ হোসেন জিমু-গাইবান্ধা :
গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার বনগ্রাম ইউনিয়নের ইদ্রাকপুর গ্রামে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, বাজারসংলগ্ন স্থান এবং ইদ্রাকপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের পাশেই দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে ইট উৎপাদন করে যাচ্ছে MAB ব্রিকস। পরিবেশ অধিদপ্তর (DoE) ও ফায়ার সার্ভিসের কোনো অনুমোদন ছাড়াই ভাটাটি পরিচালিত হলেও প্রশাসনের রহস্যজনক নীরবতায় এটি বহাল তবিয়তে চলছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রায় ২ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা এই ইটভাটার পরিচালক আনোয়ার হোসেন। ভাটার একাংশের অদূরেই ইদ্রাকপুর বাজার এবং কয়েকশ গজ দূরত্বে অবস্থিত ইদ্রাকপুর উচ্চ বিদ্যালয়। আইন অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার ও আবাসিক এলাকা থেকে ন্যূনতম এক কিলোমিটার দূরে ইটভাটা স্থাপনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে। বিদ্যালয় চলাকালীন সময়েও ভাটার চিমনি থেকে নিরবচ্ছিন্ন কালো ধোঁয়া ও ছাই উড়ে এসে স্কুল চত্বরে ছড়িয়ে পড়ছে, ফলে শিক্ষার্থীরা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পাঠগ্রহণে বাধ্য হচ্ছে।
ফসলি জমির মাটি লুট, গ্রামীণ রাস্তা ধ্বংস
স্থানীয়দের অভিযোগ, ইটভাটার কাঁচামাটির জন্য ফসলি জমির উর্বর টপসয়েল কেটে রাতের আঁধারে ট্রাক্টর-ট্রলি ও ট্রাকে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এতে কৃষিজমি স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি ওভারলোড যানবাহনের কারণে গ্রামীণ কাঁচা ও পাকা রাস্তা ভেঙে পড়েছে। রাস্তাজুড়ে সারাক্ষণ ধুলার আস্তরণ, বর্ষায় কাদা জমে চলাচল অযোগ্য হয়ে পড়ে। এতে স্কুলগামী শিক্ষার্থী ও রোগী পরিবহন চরম ঝুঁকির মুখে পড়ছে। এসব কর্মকাণ্ড স্থানীয় সরকার আইন, পরিবেশ আইন ও সড়ক পরিবহন আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন।
২০০ শ্রমিক, নেই নিরাপত্তা
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভাটাটিতে প্রতিদিন কাজ করেন প্রায় ২০০ জন পুরুষ শ্রমিক। অথচ অগ্নি নিরাপত্তার জন্য রয়েছে মাত্র একটি আগুন নির্বাপক যন্ত্র। ২০০ জন শ্রমিকের জন্য মাত্র দুটি বাথরুম, নেই মাস্ক, সেফটি জুতা কিংবা চিকিৎসা সুবিধা। রান্নার কাজে নিয়োজিত একমাত্র নারী শ্রমিকের জন্যও নেই কোনো স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা। শ্রম আইন অনুযায়ী এসবই গুরুতর অপরাধ।
ধোঁয়া-ছাইয়ে বিপন্ন জনস্বাস্থ্য
ভাটার কালো ধোঁয়া ও ছাইয়ে আশপাশের বসতবাড়ি ও ইদ্রাকপুর উচ্চ বিদ্যালয় এলাকা ঢেকে যাচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, শিশু, শিক্ষার্থী ও বৃদ্ধদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, চোখ জ্বালা ও শ্বাসজনিত রোগ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। শিক্ষার্থীরা ধোঁয়ার মধ্য দিয়েই স্কুলে যাতায়াত করতে বাধ্য হচ্ছে।
ছোট মাপের ইট-ভোক্তা প্রতারণা
সরকারি মান অনুযায়ী ইটের নির্ধারিত মাপ ১০ ইঞ্চি × ৫ ইঞ্চি × ৩ ইঞ্চি হলেও সরেজমিনে মেপে দেখা গেছে, MAB ব্রিকসে উৎপাদিত ইটের দৈর্ঘ্য ৯.৩ ইঞ্চি, প্রস্থ ৪.৬ ইঞ্চি এবং উচ্চতা ২.৫ ইঞ্চি। যা BSTI মান লঙ্ঘন এবং সরাসরি ভোক্তা প্রতারণার শামিল। এ অপরাধের জন্য মামলা, জরিমানা ও ইট বাজেয়াপ্তের বিধান রয়েছে।
প্রশ্নবিদ্ধ প্রশাসনের ভূমিকা
এতসব অনিয়ম, সরেজমিন প্রমাণ ও স্থানীয়দের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও ইটভাটিটি কেন বন্ধ হচ্ছে না-তা নিয়ে এলাকায় তীব্র আলোচনা চলছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় প্রশাসন নীরব দর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ।
এলাকাবাসীর দাবি
এলাকাবাসী দ্রুত পরিবেশ অধিদপ্তর, উপজেলা প্রশাসন, শ্রম অধিদপ্তর, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও পুলিশ প্রশাসনের যৌথ অভিযান, অবৈধ ইটভাটা সিলগালা, ইট বাজেয়াপ্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
প্রশ্ন একটাই-আইন কি কেবল বইয়ের পাতায়, নাকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশেই অবৈধ ইটভাটার চিমনির নিচে চাপা পড়বে?

