
বালিপ টেক লিমিটেড। ২০২৪ সালের শেষের দিকে এই সফটওয়্যার কোম্পানির জন্ম। প্রথম থেকেই তার কাজগুলো ছিলো সন্দেহপ্রবন। তাদের কোন বিজনেস প্ল্যান নাই। নেই কোন প্রোডাক্ট সেল করার ইচ্ছা। তারা তাদের এমপ্লয়িদের বলে ফেসবুকের ক্লোন বানাতে, ইউটিউবের ক্লোন বানাতে। সেই সাথে তারা কোর্স সেল করবে পৃথিবীব্যাপি। আই ই এল টি এস, নেটওয়ার্কিং সহ বিভিন্ন কোর্স করিয়ে চাকরির নিশ্চয়তা দিবে। ভালো কথা, তাদের ৫১, ৫৪ বা ৬৪ টা দেশে (একেকজন একেকটা বলে) শাখা আছে।
এটি ছিল ২০০টি পরিবার এবং চাকরি খুঁজতে থাকা তরুণ শিক্ষার্থীদের একটি পরিকল্পিত গণহত্যা। ডিজিটাল স্কিল ট্রেনিং আর ওয়েব ডেভেলপমেন্ট কম্পানির নামে বালিপ ছিল সন্দেহজনক কার্যকলাপের একটি আড়াল, সম্ভবত মানি লন্ডারিং এবং আরও অনেক কিছু।
এরপরে মে মাসে ঢালাওভাবে কর্মি নিয়োগ শুরু হলো। জুনে ঈদ।
প্রতারণার টাইমলাইন:
– জুনের ৪ তারিখ: মে মাসের অর্ধেক স্যালারি দিয়ে বলা হলো ঈদের পর যেদিন অফিস খুলবে সেদিনই বাকি টাকা দিয়ে দেয়া হবে। ঈদ শেষ হলো। কিন্তু বাকি টাকা আর পাই না।
– জুন শেষ হয়ে জুলাই: একদিন মাইক্রোসফট টিমসে জানানো হলো ২২ তারিখে স্যালারি দিবে।
– ২২ তারিখ: বললো আগস্টের ৩ তারিখ।
– এরমধ্যে চেয়ারম্যান দুবাই চলে গেছে। হয়তো টাকা দিতে না পারার হতাশা কাটিয়ে উঠার জন্য একটু রিফ্রেশমেন্ট দরকার ছিলো।
– আগস্টের ৩ তারিখ: নতুন এক এক্টিং চেয়ারম্যান এসে বললো, আমি তো নতুন, এগুলো কিছু জানি না। আমাকে কিছুদিন সময় দাও। ১৪ তারিখের মধ্যে আমি সব ঠিক করে দিবো। ৭ তারিখে অল্প কিছু টাকা পেলাম, যা এক মাসের স্যালারির সমান ও না।
– ১৪ তারিখ: তারা হাত জোর করে মাফ চাইলো। ২১ তারিখ টাকা দিবে বললো।
– ২১ তারিখ: চেয়ারম্যান এসে আমাদের জানালো সে এগুলো কিছুই জানে না। তাকে ২৮ তারিখ পর্যন্ত সময় দিতে হবে।
– ২৮ তারিখ: বলা হলো ইনভেস্টমেন্ট আসছে। ইনভেস্টরের প্লেইনের টিকেট ক্যানসেল হয়েছে। ইনভেস্টর টাকা নিয়ে গাড়িতে করে আসছে। কালকে ফার্স্ট আওয়ারে টাকা পেয়ে যাবেন। সেইদিন রাত ১:৩০ এর দিকে জানানো হলো, অনিবার্য কারনে ৩১ তারিখ পর্যন্ত অফিস বন্ধ।
– পরদিন অফিসে তালা পেয়ে চেয়ারম্যানের বাসায় গেলাম। উনি বাসায় নেই। উনার বাসার ঠিক পাশেই ডিজিএম এর বাসা। তাকে বাসা থেকে এনে অফিস খোলানো হলো। পুলিশ আসলো। পুলিশকে চেয়ারম্যান ১ তারিখে টাকা দেবার কথা বললো সম্ভবত।
এভাবে চেয়ারম্যান ডেটের পর ডেট দিতেই থাকলো।
– সেপ্টেম্বরের ২৯ তারিখ: সে লাস্ট একটা ডেট দেয়। আমাদের প্ল্যান ছিলো টাকা না পেলে অফিসের সামনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করবো। আমাদের জানানো হয়, ইনভেস্টর অফিস পরিদর্শনে আসছে। এখন এমন বিশৃংখলা করলে টাকা দেয়া সম্ভব হবে না। ইনভেস্টর আজকেই টাকা দিবে এবং আমরা টাকা না পেলে বাসায় যাবো না। শেষ পর্যন্ত টাকা আর পেলাম না।
– নভেম্বরের ২ তারিখ: চেয়ারম্যান তপু আহমেদ শ্রম আদালতে তার লয়্যারকে দিয়ে জানায় সে সব টাকা দিয়ে দিবে, দেড় দুই মাস সময় লাগবে।
তারিখগুলো একটু এদিক ওদিক হতে পারে, তবে মূল ঘটনা এটাই।
কারা এই অপরাধীরা?
বালিপের চেয়ারম্যান তাপু আহমেদ একজন দণ্ডিত অপরাধী। তার অধীনস্থরা যেমন সাজ্জাদ ইভ্যালি কেলেঙ্কারিতে জড়িত ছিল, ডিবিএল গ্রুপের সাইফুদ্দিন, গোলাম বাকি এবং আরও অনেকেই আওয়ামী লীগের বীজ। ফাইনান্স ডাইরেক্টর সাইদুর রহমান নাসা গ্রুপের একজন অডিটর ছিলেন এবং ওই গ্রুপের অডিটর হিসেবে ওই গ্রুপের দুর্নীতির সাথে তার জড়িত থাকার অভিযোগ আছে।
তপু আহমেদের আসল পরিচয়:
– ইন্টারনেটে ২৪ এর ডিসেম্বরের আগে তার কোন ট্রেস পাওয়া যায় না। যদিও সে শো অফ করতে খুব পছন্দ করে। উনি তার টিকটকে এবং বাস্তব জীবনেও যথেষ্ট শো অফ করতো।
– ইন্টারনেটে তার তথ্য না পাওয়ার একটা কারন অবশ্য আছে। কারন সে তপু আহমেদ না! উনার এনআইডি ২ টা। একটা তপু আহমেদ। একটা মুশতাক আহমেদ। তপু আহমেদ নামের যে এনআইডি, সেখানে আবার ছবি অন্য একজনের।
– তার সম্পর্কে শোনা যায়, সে ক্যাসিনো সম্রাটের সাথে একসময় যুক্ত ছিলো এবং জেল খেটেছে।
– এর আগে তার অক্সডোরা নামে একটা কোম্পানি ছিলো। সেখানেও কর্মিদের বেতন বাকি রেখে কোম্পানি বন্ধ করে দিয়েছে। আওয়ামী লীগের আমলে এই কাজ তার জন্য খুব বেশি কঠিন ছিলো না হয়তো।
– এছাড়া বালিপ টেকের যে কয়জন ডিরেক্টর, তার প্রায় সবাই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত বা সেই আমলে দূর্ণীতি করে প্রচুর কালো টাকার মালিক। কয়েকজনের ব্যাপারে আমাদের কাছে প্রমানও আছে।
প্রশ্ন আসতেই পারে – কেন বলছি তাকে বা তাদেরকে হাসিনার কুকুর?
– চিন্তা করে দেখেন, একটা সফটওয়্যার কোম্পানি কেন কোন প্রোডাক্ট লঞ্চ করতে চাচ্ছে না?
– তপু আহমেদ কে, যে ছয় মাসে ২০০ এমপ্লয়ি নেবার সাহস করে? তার আগের বড় কোন ব্যাবসার কথা কেউ জানে না। কিন্তু জুলাই অভ্যুত্থানের পর হঠাৎ করে এতো টাকা কোথায় থেকে পেলো?
– এই কোম্পানির মূল উদ্দেশ্য ছিলো আইনের ফাক ফোকর দিয়ে, একটা কোম্পানি দেখিয়ে এদের কালো টাকা সাদা করা এবং একটা বড় অংশ পাচার করা।
কর্মীদের ভোগান্তি – মানবিক বিপর্যয়
তারা ২০০ জন মানুষকে অবৈতনিক শ্রম দিয়ে মাসের পর মাস প্রতারণা করেছে এবং এখন আমরা প্রতিবাদ করলে এবং আইনি পদক্ষেপ নিলে তারা আমাদের হুমকি দেয়।
শুধুমাত্র তাদের প্রতারণা এবং লোভের কারণে অনেক মানুষের জীবন ধ্বংস হয়ে গেছে।
– আমি নিজে মহাখালীর আম্বন কমপ্লেক্সের ছাদ থেকে লাফ দিতে যাওয়া একজন সহকর্মীকে থামিয়েছি, যেখানে অফিস ছিল। আমাদের যে ফ্লোর দেওয়া হয়েছিল সেটি আগে গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্সের দখলে ছিল, যা আরেকটি প্রতারণা ছিল। তাই সম্ভবত বিল্ডিং কর্তৃপক্ষও এতে জড়িত ছিল।
– একজন কর্মীর বাবা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন, কিন্তু চিকিৎসার খরচ না থাকায় তিনি আজ মৃত্যু সজ্জায়। কোম্পানি ৬ মাসের বকেয়া বেতন দেয়নি বলে তিনি কিছুই করতে পারেননি।
– অনেক নারী সহকর্মী অফিসের কিছু পরিচালকদের দ্বারা হয়রানির শিকার হয়েছেন।
– তারা আমাদের তারিখ দিত এবং কাজ করাত। তারা দিনের বেলা মদ্যপানের আসর করত। এটি ছিল আওয়ামী লীগ অপরাধী এবং অন্যান্য প্রতারকদের আশ্রয়স্থল।
– প্রতি মাসে “পরের মাসে বেতন দেওয়া হবে” এই মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে কর্মীদের কাজে আটকে রাখা হয়েছে।অনেকে ইতোমধ্যে অন্য চাকরির সুযোগ হারিয়েছেন।
– অধিকাংশ কর্মী বেঁচে থাকার জন্য এনজিও থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হয়েছেন।
– আরেকজন নতুন বাবা তার সন্তানের জন্মের খরচ মেটাতে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন কারণ প্রতিশ্রুত বেতন কখনোই আসেনি।
– অনেকে বাসা ভাড়া দিতে না পেরে বাড়িওয়ালার কাছে অপমানিত হয়েছেন এবং তাদের বাধ্য হয়ে বাসা ছাড়তে হয়েছে।
জরুরি আবেদন
আমরা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), এবং সকল আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে জরুরি সাহায্য চাইছি। দয়া করে এই মামলাটি দ্রুত তদন্ত করতে এবং পলাতক তাপু আহমেদ সহ সকল অভিযুক্তদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনতে আমাদের সাহায্য করুন।
সাধারণ মানুষ এবং গণমাধ্যমের কাছেও আবেদন, অনুগ্রহ করে শেয়ার করুন এবং মানুষকে জানান। আমরা আইনি পথে এগোচ্ছি কিন্তু তারা প্রভাব খাটিয়ে আমাদের থামানোর চেষ্টা করছে।
আওয়ামী লীগ ১৬ বছরে দেশের শুধু খোলসটা রেখেছে। অল্প যা কিছু আছে সেটাও যদি এদের দ্বারা ধংস হয়ে যায়, তবে সত্যিই আমাদের আর কিছুই থাকবে না। তখন যে অল্প কিছু মেধাবী আছে তারাও দেশ ছেড়ে পালাবে। আর তপু ওরফে মুশতাক আহমেদরা বিদেশে বসে দেশটাকে শুষে নিবে।

