

আওরঙ্গজেব কামাল :
১৮ অক্টোবর ২০২৫ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। “জুলাই সনদ” নামে বহুল আলোচিত রাজনৈতিক চুক্তি প্রধান উপদেষ্টা ড. মোহাম্মদ ইউনুসসহ ২৫টি রাজনৈতিক দলের নেতাদের স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে কার্যকর রূপ পেল। দীর্ঘদিন ধরে বিরোধপূর্ণ রাজনীতির অচলাবস্থা নিরসনের আশায় এই উদ্যোগ নেওয়া হলেও, এর বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব—এখন সেটিই জনমনে প্রধান প্রশ্ন।
প্রথমেই মনে রাখতে হবে, রাজনৈতিক চুক্তি মানেই বাস্তব প্রয়োগ নয়। বিগত দিনে যখন যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে তখন সেই তার ইচ্ছামত গঠনতন্ত্র পরিবর্তন করেছে। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা বলছে, অতীতের বহু অঙ্গীকার ও সমঝোতা কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। যেটা অনেক প্রমাণ দিতে গেলে আমার অনেক সময় লাগবে। একটি দেশের স্বৈরাচার তখনই শুরু হয় যখন দেশের মধ্যে গণতন্ত্র নিপাত যায়। বিগত পনেরো বছর যাবত এই ধারাবাহিকতা দেশে বিরাজ করেছে। আমার মনে হয় গণতন্ত্র কোমায় থেকে চোখ মেলে তাকাচ্ছে। সুস্থ সবল দেহ নিয়ে সঠিকভাবে চলতে পারবে কিনা তা আমি জানিনা। গণতন্ত্রের চিকিৎসকের অনেক যশ খ্যাতি রয়েছে। এখন প্রশ্ন হল সঠিক সময় সঠিক চিকিৎসা দিতে পারবে কিনা। জুলাই সনদে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন, স্বচ্ছ ভোটার তালিকা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। নিঃসন্দেহে এগুলো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য শর্ত। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—দলগুলো আদৌ কি নিজেদের স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে এই প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নে আন্তরিক হবে? যে দল ক্ষমতায় আসবে তার ভূমিকা কি হবে। এর কি গ্যারান্টি রয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক চরিত্র সমালোচনা করতে যে বিরোধী জড়িয়ে পড়ে। যে কারণে ফ্যাসিবাদী জন্ম হয়। আর এই ফ্যাসিবাদী রুখে দেয়ার জন্য জুলাই সনদ জন্ম নিয়েছে। তবে আমি মনে করি,
এখানে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ সামনে এসেছে। প্রথমত, দলগুলোর পারস্পরিক আস্থাহীনতা। একে অপরকে বিশ্বাস করতে না পারার প্রবণতা আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি বড় দুর্বলতা। বিএনপি চায় নির্বাচনের সঙ্গে সমান্তরালভাবে রেফারেন্ডাম হোক, অপরদিকে কিছু দল চাইছে ভোটের আগেই গণভোট অনুষ্ঠিত হোক। এ ধরনের মতবিরোধ কেবল সময়ক্ষেপণই নয়, সনদের কার্যকর প্রয়োগকেও বাধাগ্রস্ত করছে। দ্বিতীয়ত, প্রশাসন ও নির্বাচন ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহ। জনগণ এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকবে। অতীতের অভিজ্ঞতা ও অভিযোগ এ সন্দেহকে আরও ঘনীভূত করেছে। বিগত দিনে আমরা দেখেছি, নির্বাচনে পেশী শক্তির ব্যবহার হয়েছে, নির্বাচন কমিশন এর কর্তারা একটা পক্ষ পাত করছে। দিনের ভোট, ভোটের আগের রাতেই ব্যালট বাক্স পূর্ণ করেছে। কখনো কখনো ভোট বেশি হয়ে যাওয়ায় তা আবার ফেলে দিতে দেখা গেছে। নির্বাচনের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিজাইটিং অফিসার কোন না কোন দল বা ব্যক্তি কে অবস্থান নিতে দেখা গেছে। প্রশাসনের ভিতর এখনো ফ্যাসিবাদের দোষ রয়েছে। সব মিলিয়ে জনগণ এখনো একটি অবাধ ষষ্ঠ নির্বাচন হবে এই আশা করতে পারছে না। একটি জরিপে (BIGD-এর Pulse Survey, জুলাই ২০২৫) দেখা গেছে, ৪৮.৫ শতাংশ মানুষ এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি তারা কাকে ভোট দেবে। এর মূল কারণ তারা ভালো প্রার্থী খুঁজে পাচ্ছে না।
অন্যদিকে প্রায় ৫১ শতাংশ মানুষ বলেছে—প্রয়োজনীয় সংস্কার ছাড়া নির্বাচন অর্থহীন। অর্থাৎ জনমতের বড় একটি অংশ নির্বাচনের আগে বাস্তব পরিবর্তন দেখতে চায়। আর জুলাই সনদ স্বাক্ষরের দিন আহত ছাত্র-জনতার যে আন্দোলন তাতে লক্ষ্য করা গেছে জুলাই সনদে তাদের মনোবাসনা পূরণ হয়নি।জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া “জুলাই যোদ্ধারা” সনদে প্রত্যাশিত স্বীকৃতি ও সুযোগ-সুবিধা পাননি—এ নিয়ে ইতিমধ্যেই ক্ষোভ রয়েছে। আহত ছাত্র-জনতা ও আন্দোলনে অংশ নেওয়া সাধারণ মানুষদের দাবি, সনদে তাদের আত্মত্যাগের মূল্যায়ন স্পষ্টভাবে উঠে আসেনি। বরং রাজনৈতিক দলগুলোর স্বার্থই প্রাধান্য পেয়েছে। এর ফলে যারা গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সম্মুখসারিতে ছিল, তারা নিজেদের বঞ্চিত মনে করছে। সে যাই হোক ভালোই ভালোই জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছেন অধিকাংশ রাজনৈতিক দল। এখন প্রশ্ন হচ্ছে—ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কি জুলাই সনদের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হবে? প্রধান উপদেষ্টা ঘোষণা করেছেন, ফেব্রুয়ারিতেই নির্বাচন হবে। কিন্তু কীভাবে হবে, তার সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে নিতে হবে। অর্থাৎ, সনদের সফল বাস্তবায়ন নির্ভর করছে দলগুলোর সদিচ্ছা ও পরস্পরের প্রতি ন্যূনতম আস্থার ওপর। অবশ্যই কিভাবে নির্বাচন হবে সেটা রাজনৈতিক দলদের একটি বিডি বসে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কিন্তু বর্তমানে সে রূপরেখা উল্টো পথে হাঁটছে। জামাত এখনো সেই পি আর পদ্ধতি নিয়েই পড়ে রয়েছে। এনসিপিও বি ভিন্ন মত পোষণ করছে। আর বাংলাদেশের সর্ব বৃহত্তম দল বিএনপি পূর্বের নির্বাচনের নিয়মের পক্ষেই অনর রয়েছেন। তাহলে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হবে কিভাবে? আমার মতে, জুলাই সনদের যে অংশগুলো বাস্তবায়নের সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি, তা হলো—নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের পুনর্গঠন ও দায়িত্ব বণ্টন। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই কঠোর নজরদারি করতে হবে যে দায়িত্বপ্রাপ্তদের মধ্যে কোন ফ্যাসিবাদ লুকিয়ে রয়েছে কেন। ভোটার তালিকা ও ভোটগ্রহণ পদ্ধতিতে স্বচ্ছতা আনা। এবং সীমানা নির্ধারণের জটিলতা অতি দ্রুত নিরাশন করা। এছাড়া যে বিষয়টি রয়েছে সেটা হল গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। নির্বাচনে গণমাধ্যম কর্মীদের যথাযথভাবে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের সুযোগ করে দেওয়া। এবং গণমাধ্যম কর্মীদের অভিযোগের উপর দৃষ্টি রেখে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির যথাযথ দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা। এছাড়া
বিচার বিভাগের কার্যকর স্বাধীনতা ও সংস্কার কিন্তু সব শর্ত একসাথে ও দ্রুত বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত কঠিন হবে। বিশেষ করে রেফারেন্ডাম, সংবিধান সংশোধন ও নির্বাচনের সময়সূচি নিয়ে দ্বিমত নিরসন না হলে সনদটি কেবল প্রতীকী চুক্তি হিসেবেই থেকে যাবে। এটা বাস্তবে আলোর মুখ দেখবে না। নির্বাচন কমিশন কি গ্যারান্টি দিতে পারবে ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে কোন প্রাণহানির ঘটনা ঘটবে না। এইজন্য নির্বাচন কমিশনকে অত্যন্ত যাচাই-বাছাই করে নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বেছে নিতে হবে এটাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। “জুলাই সনদ” নিঃসন্দেহে একটি শুভ উদ্যোগ এবং গণতান্ত্রিক সংস্কারে প্রতিশ্রুতিশীল পদক্ষেপ। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের টিকে থাকা, আসন্ন নির্বাচনকে স্বচ্ছ করা এবং জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার—সবকিছুর ভিত্তি এখন এই সনদের সফল প্রয়োগের ওপর নির্ভর করছে। আমরা ঐ সময় জুলাই সনদের সফলতা ভোগ করব। যখন রাজনৈতিক দলগুলো ঐক্যবদ্ধ হতে পারবে। আর গণমাধ্যম নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবে। আর এসব কিছুই এখন সময়ের ব্যাপার।আমরা “জুলাই সনদ” এর সাফল্য ভোগ করব তখনই, যখন রাজনৈতিক দলগুলো সত্যিকার অর্থে ঐক্যবদ্ধ হবে, জুলাই যোদ্ধাদের ন্যায্য প্রাপ্য নিশ্চিত করবে এবং গণমাধ্যমকে নিরপেক্ষভাবে কাজ করার স্বাধীনতা দেবে। অন্যথায় ইতিহাসের পাতায় এটি যুক্ত হবে আরেকটি ব্যর্থ চুক্তির তালিকায়।
লেখক ও গবেষক:
আওরঙ্গজেব কামাল
সভাপতি, ঢাকা প্রেস ক্লাব
