
মুসলিম উদ্দীন, চট্টগ্রাম, মীরসরাই :
মানুষের সেবাকেই যিনি জীবনের ব্রত হিসেবে নিয়েছেন, তিনি ডা. এস. এ. ফারুক। পেশায় একজন শিশু বিশেষজ্ঞ হলেও মানবিকতা, সমাজসেবা ও ধর্মীয় মূল্যবোধে অনুপ্রাণিত অসংখ্য উদ্যোগের কারণে তিনি আজ মিরসরাই ও ফটিকছড়ির মানুষের কাছে একজন আলোকিত ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত। দীর্ঘ ৪ দশক ধরে তিনি মিরসরাইয়ে চিকিৎসা সেবা দিয়ে আসছেন। বিশেষ করে নবজাতক ও শিশুদের চিকিৎসায় অসংখ্য পরিবারের আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছেন তিনি। সাধারণ মানুষের মুখে মুখে তিনি পরিচিত “মানবিক ডাক্তার” হিসেবে।
শহীদ পরিবারের সন্তান ডা. এস. এ. ফারুকের জীবনের শুরুটাও ছিল বেদনাবিধুর। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ৬ এপ্রিল চট্টগ্রাম শহর থেকে স্বপরিবারে বাড়ি ফেরার পথে পাক হানাদার বাহিনীর অতর্কিত গু’লি’ব’র্ষ’ণে তিনি হারান বাবা, মা, দুই ভাই ও একমাত্র বোনকে। পরিবারের সেই নির্মম আত্মত্যাগ তার জীবনদর্শনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। পরবর্তীতে মানুষের সেবাকেই তিনি জীবনের মূল লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেন।
চিকিৎসা পেশার পাশাপাশি মানবিক দায়িত্ববোধ থেকেই তিনি প্রতিষ্ঠা করেন “সেফা ইনসান হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার”। সময়ের ব্যবধানে এটি শুধু একটি হাসপাতাল নয় বরং সাধারণ মানুষের নির্ভরতার ঠিকানায় পরিণত হয়েছে। এখানে শিশুদের পাশাপাশি নানা রোগে আক্রান্ত মানুষ আন্তরিক পরিবেশে চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন। তিনি ৩০০ টাকা ফিতে আজীবন রোগী দেখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
তবে ডা. ফারুকের পরিচয় কেবল একজন চিকিৎসকেই সীমাবদ্ধ নয়। চিকিৎসা পেশা থেকে অর্জিত আয় এবং নিজের সম্পত্তি বিক্রি করে গচ্ছিত অর্থের বড় একটি অংশ তিনি ব্যয় কওে চলেছেন মানবকল্যাণে। সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়াতে তিনি গড়ে তুলেছেন একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ, হেফজখানা ও মানবিক উদ্যোগ। অনেক দরিদ্র পরিবার পেয়েছে শিক্ষার সুযোগ, অনেক অসহায় মানুষ পেয়েছে চিকিৎসা ও সহযোগিতা। এছাড়া তিনি মিরসরাই ও ফটিকছড়ি উপজেলার অসংখ্য মসজিদ, মাদ্রাসা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংস্কার ও নির্মাণে বড় অংকের আর্থিক সহায়তা প্রদান করে আসছেন।
২০২১ সালের ২৬ নভেম্বর ফটিকছড়ি উপজেলার ২ নম্বর দাঁতমারা ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বালুখালী গ্রামে মা-বাবার নামে নির্মাণ করেন দ্বিতল “শহীদ রওশন-জামান জামে মসজিদ”। ১৯৫৬ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৬৫ বছর এটি ছিল একটি মাটির পাঞ্জেগানা মসজিদ, যেখানে সর্বোচ্চ ৮ জন মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারতেন। বর্তমানে দ্বিতল মসজিদটিতে আড়াই শতাধিক মুসল্লি একসাথে নামাজ আদায় করতে পারেন। রমজানে এখানে মহিলারা জামাতের সাথে খতম তারাবির নামাজ আদায় করেন। ফটিকছড়ি উপজেলায় মহিলাদের মসজিদে নামাজ আদায়ের ক্ষেত্রে এটি দ্বিতীয় মসজিদ হিসেবে পরিচিত।
একই মসজিদে ২০২৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মুক্তিযুদ্ধে শহীদ একমাত্র বোনের নামে গড়ে তোলেন “শহীদ শাহীন আরা খানম স্মৃতি ইসলামী পাঠাগার”। এই পাঠাগারে রয়েছে আড়াই শতাধিক ইসলামী বই, যার মধ্যে বাংলা ব্যাখ্যাসহ তাফসিরুল কুরআন, বোখারি শরিফসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইসলামিক গ্রন্থ রয়েছে।
মসজিদের মোতাওয়াল্লী আফজল আহমেদ বলেন, “মাটির টিনশেড মসজিদ দ্বিতীয় তলা ভবনে রূপ নেবে তা আমরা কখনো কল্পনাও করিনি। আল্লাহর অশেষ মেহেরবানীতে ডা. এস. এ. ফারুকের ব্যক্তিগত অর্থায়নে এই মসজিদ নির্মিত হয়েছে। রমজানে প্রায় শতাধিক মহিলা এখানে জামাতের সাথে খতম তারাবির নামাজ আদায় করেন। ২০২১ সাল থেকে জুমার নামাজও চালু হয়েছে। ইসলামি পাঠাগারটি এলাকার তরুণদের ইসলামি শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।”
মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি জিয়াউল হক বলেন, “আমরা গ্রামবাসী আজীবন ডা. এস. এ. ফারুকের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবো। আমাদের গ্রাম ছিল অত্যন্ত অবহেলিত। আগে জুমার নামাজ আদায়ের জন্য দূর-দূরান্তে যেতে হতো। তিনি প্রায় ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে এই মসজিদ নির্মাণ করে দিয়েছেন। আমরা একসময় তাকে শিশু ডাক্তার হিসেবে চিনতাম, এখন তিনি মানবদরদী মানুষ হিসেবেও পরিচিত।”
২০২৫ সালে ফটিকছড়ি উপজেলার দাঁতমারা ইউনিয়নের গ্রামপাড়ায় শ্বশুর-শাশুড়ির নামে “গ্রামপাড়া নূরানী তালীমূল কুরআন মাদ্রাসায়” চালু করেন “হাছিনা-কামাল হেফজখানা”। এখানে একসাথে ২৫ জন শিক্ষার্থী হেফজ পড়াশোনা করতে পারে। বর্তমানে ২৩ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত রয়েছে।
মাদ্রাসার পরিচালক হাফেজ মাওলানা ইসমাঈল হোসেন বলেন, “ডা. এস. এ. ফারুকসহ এলাকার দানশীল মানুষের সহযোগিতায় এই হেফজখানা চালু করা হয়েছে। প্রথমে ৮ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু হলেও বর্তমানে এখানে ২৫ জনের আসন রয়েছে।”
এছাড়া ২০২৩ সালে নিজ গ্রাম মিরসরাই উপজেলার ৫ নম্বর ওচমানপুর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের পাতাকোট এলাকায় মা-বাবার নামে প্রতিষ্ঠা করেন “শহীদ রওশন-জামান নূরানী মাদ্রাসা”। সামান্য বেতনে এখানে আশপাশের শিশুরা পড়াশোনা করার সুযোগ পাচ্ছে। বর্তমানে ৫টি শ্রেণিতে ১১৫ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে, যার মধ্যে ৩০ জন সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছে।
মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ ইলিয়াছ বলেন, “আমরা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সামান্য বেতন নিয়ে থাকি। মাদ্রাসার অধিকাংশ ব্যয় বহন করেন ডা. এস. এ. ফারুক। ২০২৪ ও ২০২৫ সালের বোর্ড পরীক্ষায় এই মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা শতভাগ পাশ করেছে।”
২০১৮ সালের ৬ এপ্রিল নিজ গ্রাম পাতাকোটে একক অর্থায়নে প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে পুনর্র্নিমাণ করেন “হাজী আব্দুর রশিদ জামে মসজিদ”। পূর্বে এটি “হলুদ মসজিদ” নামে পরিচিত ছিল। আধাপাকা পুরনো মসজিদটি ভেঙে সেখানে নান্দনিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মাণ করা হয় আধুনিক মসজিদ। জনশ্রুতি রয়েছে, এটিই মিরসরাইয়ের প্রথম আর্কিটেকচারাল মসজিদ।
এই মসজিদে ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে বয়স্কদের জন্য সহীহ কুরআন শিক্ষা কার্যক্রম চালু করেন তিনি। ৩০ জন বয়স্ক ব্যক্তিকে নিয়ে শুরু হওয়া এই কার্যক্রমের মাধ্যমে বৃদ্ধ বয়সেও মানুষ শুদ্ধভাবে কুরআন শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছেন। এছাড়া শিশু-কিশোরদের টানা ৪০ দিন জামাতে নামাজ আদায়ে উৎসাহিত করতে পুরস্কারের ব্যবস্থাও করা হয়।
একই মসজিদে ২০২০ সালে মা-বাবার নামে চালু করেন “শহীদ রওশন-জামান হিফজ মাদ্রাসা”। এখানে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে থাকা-খাওয়াসহ ১০ জন শিক্ষার্থীর হিফজ পড়াশোনার ব্যবস্থা রয়েছে।
হাজী আব্দুর রশিদ জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা আবুল হাশেম বলেন, “মসজিদ পুনঃনির্মাণের আগে এখানে সর্বোচ্চ ১ শত মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারতেন। এখন প্রায় ৬ শত মুসল্লি একসাথে নামাজ আদায় করতে পারেন। এছাড়া হেফজখানা ও বয়স্কদের কুরআন শিক্ষার ব্যবস্থাও করেছেন তিনি। দ্বীনের অনেক খেদমত করছেন।”
শহীদ রওশন-জামান হিফজ মাদ্রাসার শিক্ষক হাফেজ তৌহিদ আরমান বলেন, “এই হেফজ মাদ্রাসার সকল ব্যয় ডা. এস. এ. ফারুক নিজেই বহন করেন। শিক্ষার্থীদের থাকা-খাওয়া থেকে শুরু করে যাবতীয় প্রয়োজনীয় খরচ তার ব্যক্তিগত অর্থায়নেই পরিচালিত হয়।”
এছাড়া তিনি দীর্ঘ দেড় যুগ ধরে নিজ প্রতিষ্ঠিত হাসপাতাল ও নিজ বাড়িতে লায়ন্স চক্ষু হাসপাতালের উদ্যোগে বিনামূল্যে চক্ষু চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থা করে আসছেন। ইতোমধ্যে কয়েক হাজার মানুষ এই সেবা গ্রহণ করেছেন। তার ব্যক্তিগত উদ্যোগে অসংখ্য মানুষ বিনামূল্যে চক্ষু অপারেশনের সুযোগও পেয়েছেন।
ডা. এস. এ. ফারুকের ব্যক্তিগত অর্থায়নে ইতোমধ্যে ৩১ জন শিক্ষার্থী হেফজ সম্পন্ন করেছেন এবং বর্তমানে আরও ১৩ জন শিক্ষার্থী হেফজ পড়াশোনা করছে। এছাড়া তিনি নিজ বাড়িতে বয়স্ক মহিলাদের জন্য কুরআন শিক্ষার ব্যবস্থাও করেছেন। বর্তমানে সেখানে ৩০ জন বয়স্ক মহিলা কুরআন শিক্ষা নিচ্ছেন।
ডা. এস. এ. ফারুক বলেন, “আমার স্কুল জীবনে আমার বাবা সবসময় বলতেন আমাকে ডাক্তারি পড়াবেন। আল্লাহর রহমতে সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। কিন্তু আমার বাবা সেটি দেখে যেতে পারেননি। বাবার খুব ইচ্ছে ছিল আমি ডাক্তার হয়ে গ্রামে গিয়ে মানুষের সেবা করবো। আমি সেই কথাগুলো অক্ষরে অক্ষরে পালন করার চেষ্টা করছি। সরকারি চাকুরিতে থাকা অবস্থাতেই গ্রামের মানুষের সেবা করার উদ্দেশ্যে গ্রামে চলে এসেছি। আমি চাই মানুষ স্বল্পমূল্যে চিকিৎসা সেবা পাক। পাশাপাশি সমাজের কল্যাণে কাজ করারও চেষ্টা করছি। বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও হেফজখানা নির্মাণ করেছি। বৃদ্ধ বয়সে যারা শুদ্ধভাবে কুরআন পড়তে পারেন না, তাদের জন্য কুরআন শিক্ষার ব্যবস্থা করেছি। আমার ইচ্ছে, আমার অবর্তমানেও যেন এই প্রতিষ্ঠানগুলো চলমান থাকে।

