
নিজস্ব প্রতিনিধি :
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেগম খালেদা জিয়ার নাম একটি বিশেষ ও অনন্য স্থান দখল করে। তিনি কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না, বরং দেশের ইতিহাসে নারীর ক্ষমতায়নের পথপ্রদর্শক। ১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট জন্ম নেওয়া খালেদা খানম, পরিবারের ঘনিষ্ঠদের কাছে ‘পুতুল’ নামে পরিচিত ছিলেন। একটি সাধারণ পরিবারে বেড়ে ওঠা এই নারী পরবর্তীতে শুধু নিজের জীবন নয়, দেশের রাজনৈতিক দিগন্তকেও নতুনভাবে রচনা করেছেন।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয় এক অনিশ্চিত ও সংকটপূর্ণ সময়ে। ৩৬ বছর বয়সে বিধবা হওয়ার পর তিনি দুই সন্তানকে দেখাশোনার পাশাপাশি রাজনীতির কঠিন জগতে পদার্পণ করেন। স্বামী জিয়াউর রহমানের হত্যার পর বিএনপি বিপর্যস্ত অবস্থায় পড়ে। সেই সময় দলের নেতৃত্ব নেওয়া দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি দলকে পুনরুজ্জীবিত করার পথে অবিচল থাকেন। এই সময়ে তিনি প্রমাণ করেন, সংকটের মুহূর্তেও দৃঢ় মনোবল ও নেতৃত্বের ক্ষমতা একজন নারীর মধ্যেও থাকতে পারে।
১৯৮৩ সালে খালেদা জিয়া বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান হন। পরের বছর, ১৯৮৪ সালে, তিনি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে নয় বছরের দীর্ঘ আন্দোলনের মাধ্যমে তিনি দলের অবস্থানকে শক্তিশালী করেন। এই আন্দোলনের সময় তিনবার গ্রেপ্তার হওয়া এবং আপোষহীন অবস্থান নেওয়া তাকে দেশের অন্যতম নির্ভীক নেতা হিসেবে পরিচিতি দেয়। বিএনপি নেতারা মনে করেন, এই সময়ের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মধ্যেই খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব দলকে পুনর্জীবিত করেছে।
১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে খালেদা জিয়া প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হন। নির্বাচনের আগে তিন জোটের রূপরেখায় সংসদীয় সরকার পুনঃপ্রবর্তনের অঙ্গীকার ছিল। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি তা বাস্তবায়ন করেন। দীর্ঘ ১৬ বছরের পর দেশে আবার সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা চালু হয়, যা জনগণের মধ্যে বিএনপির অবস্থানকে দৃঢ় করে। এ সময় খালেদা জিয়া একপেশে শক্তির বদলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিশ্বাস স্থাপন করেন এবং দেশকে সংবিধানিক শাসনের দিকে ফিরিয়ে আনেন।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার নেতৃত্ব কেবল ক্ষমতার চূড়ায় পৌঁছানো নয়, বরং দেশের প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করাও ছিল লক্ষ্য। তিনবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পাশাপাশি তিনি বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবেও দলের নেতৃত্ব পালন করেছেন। ১৯৯৬ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি পরাজিত হলেও তিনি সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। এই সময় তার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দেশের গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া। জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আন্দোলনের মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন, গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য দৃঢ় এবং ধারাবাহিক নেতৃত্ব অপরিহার্য। এই আন্দোলনের সময় তিনি শুধু দল নয়, দেশের সাধারণ মানুষকেও নেতৃত্ব দিয়েছেন। আন্দোলন, রাজনৈতিক সংহতি ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি তার অঙ্গীকার বিএনপিকে শক্তিশালী করেছে।
তাঁর নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো আপোষহীনতা, ন্যায়পরায়ণতা এবং দেশপ্রেম। দলের প্রতি দায়বদ্ধতার পাশাপাশি তিনি পারিবারিক দায়িত্বও পালন করেছেন। ঘনিষ্ঠরা উল্লেখ করেন, শত ব্যস্ততার মাঝেও তিনি পরিবার ও সন্তানদের প্রতি দায়িত্ব পালনে অবিচল ছিলেন। রাজনৈতিক জীবনের চাপের মধ্যেও পারিবারিক কর্তব্যে স্থিতিশীল থাকা খালেদা জিয়ার ব্যক্তিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
স্বাস্থ্যগত কারণে দীর্ঘ সময় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকলেও ২০২৪ সালের অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর খালেদা জিয়া সীমিত পরিসরে দলের কর্মকাণ্ড এবং রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানেও উপস্থিত হন। দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা, জেল এবং অসুস্থতার পরেও দলের নেতা হিসেবে তার রাজনৈতিক গুরুত্ব অপরিবর্তিত ছিল। বিএনপি দলও তাকে সর্বদা রাজনৈতিক অভিভাবক হিসেবে সামনে রেখেছে।
খালেদা জিয়ার অসুস্থতা দীর্ঘকালীন ছিল। করোনায় আক্রান্ত হওয়া, লিভার সিরোসিস, কিডনি, হার্ট এবং অন্যান্য রোগের কারণে দীর্ঘ সময় চিকিৎসা নিতে হয়েছে। ২০২৪ সালের জুনে তার হৃদপিণ্ডে পেসমেকার বসানো হয়। বিদেশে উন্নত চিকিৎসার জন্য চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি। এরপরও চিকিৎসা সাপেক্ষে গুলশানের বাসায় অবস্থান করেছেন। এই দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্যেও তিনি দেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া এবং দলের দায়িত্বে সচেষ্ট ছিলেন।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন প্রমাণ করে, কঠিন পরিস্থিতিতেও দৃঢ় মনোবল, নেতৃত্ব এবং সংকল্প থাকলে একজন নারী নিজের জীবন ও দেশের ইতিহাস দুটোই নতুনভাবে রচনা করতে পারে। গৃহবধূ থেকে নারীর ক্ষমতায়নের পথপ্রদর্শক হয়ে ওঠা, দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অবদান রাখা এবং দলকে স্থিতিশীল করা- সব মিলিয়ে তার জীবন ইতিহাসে চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে।
নারীর ক্ষমতায়ন ও নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে খালেদা জিয়ার অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। তিনি দেখিয়েছেন, নারীর নেতৃত্ব শুধু পারিবারিক বা সামাজিক সীমারেখায় সীমাবদ্ধ নয়; রাজনীতির শীর্ষেও নারীরা দেশের ইতিহাস গড়ে দিতে সক্ষম। তার জীবন প্রমাণ করে, শারীরিক সীমাবদ্ধতা, সামাজিক বাধা বা ব্যক্তিগত শোক কখনো সত্যিকারের নেতৃত্বকে বাধা দিতে পারে না।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় দিক হলো দলের পুনর্জীবন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি অঙ্গীকার এবং দেশের সংবিধান ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় অবদান রাখা। জেল, অসুস্থতা এবং দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা সত্ত্বেও তার রাজনৈতিক প্রভাব অমোঘ। দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনীতি খালেদা জিয়ার নেতৃত্বকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে।
তিনি তার জীবনে যে ত্যাগ ও নিষ্ঠার পরিচয় দিয়েছেন, তা নতুন প্রজন্মের জন্য শিক্ষণীয়। রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও তিনি ধৈর্য ও সততার সঙ্গে নেতৃত্ব দিয়েছেন। বিপদে দলের প্রতি দায়বদ্ধ থাকা, কঠিন সময়ে জনসাধারণের পাশে দাঁড়ানো এবং স্বার্থপরতার চেয়ে দেশের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়া- এগুলোই তার নেতৃত্বের মূল দিক।
খালেদা জিয়ার জীবন প্রমাণ করে, নারী নেতৃত্ব শুধু প্রতীক নয়; এটি বাস্তব ক্ষমতা, দায়িত্ববোধ এবং সংকল্পের সঙ্গে যুক্ত। গৃহবধূ থেকে দেশের শীর্ষ নেতৃত্বে ওঠার এই কাহিনী প্রমাণ করে, এক নারী কঠিন পরিস্থিতিতেও দেশের ইতিহাসে স্থায়ী প্রভাব ফেলতে সক্ষম। তার জীবন কেবল রাজনৈতিক কাহিনী নয়; এটি নারীর ক্ষমতায়ন, সংকল্প এবং নেতৃত্বের গল্প। ব্যক্তিগত শোক, রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং সামাজিক বাধা সত্ত্বেও তিনি দেশের ইতিহাসে অনন্য ছাপ রেখেছেন।
গৃহবধূ থেকে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হয়ে খালেদা জিয়া যে রাজনৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ তৈরি করেছেন, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে চিরস্মরণীয়। তার জীবন প্রজন্মের জন্য এক অনুপ্রেরণা এবং ভবিষ্যৎ নেতাদের জন্য এক শিক্ষণীয় উদাহরণ। তিনি দেখিয়েছেন, সংকল্প, নেতৃত্ব এবং নৈতিক দৃঢ়তা থাকলে একজন মানুষ- বিশেষত একজন নারী- দেশের ইতিহাসকে নতুনভাবে রচনা করতে পারে।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ও সামাজিক অর্জন, দল ও দেশের প্রতি ত্যাগ এবং অসুস্থতার মধ্যেও দায়িত্ব পালন- সব মিলিয়ে তার জীবন চিরস্মরণীয়। তিনি প্রমাণ করেছেন, নারীর নেতৃত্ব কেবল প্রতীক নয়, বাস্তব ক্ষমতা, সাহস এবং দৃঢ় সংকল্পের পরিচয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার নাম চিরকাল একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে থাকবে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শিক্ষণীয় এবং অনুপ্রেরণার উৎস।
ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ
লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ

