
পূর্বায়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান শামসুদ্দিন আহমেদের আমলনামা।
ঘটনা -১
২০০৬ সালের ৪ জুলাই রাতে ঢাকার গুলশানের ১০৪ নম্বর সড়কের একটি বহুতল ভবনের ছাদ থেকে ফেলে দিয়ে বসুন্ধরা টেলিকমিউনিকেশনস নেটওয়ার্ক লিমিটেডের তরুণ পরিচালক হুমায়ুন কবির সাব্বিরকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
ঘটনার পর ৭ জুলাই ২০০৬ তারিখে গুলশান থানায় সাব্বিরের ভগ্নিপতি এ. এফ. এম. আসিফ বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন (মামলা নং- ০৯(০৭)২০০৬) ।
মামলার তদন্তভার গ্রহণ করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। ২০০৮ সালের ১২ মে সিআইডির সহকারী পুলিশ ব্যাপক (ASP) মোহাম্মদ আরমান আলী আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। এতে বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যানের ছেলে সাফিয়াত সোবহান সানভীরকে প্রধান আসামি এবং তৎকালীন সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর (বর্তমান পূর্বায়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান) শামসুদ্দিন আহমেদসহ মোট ৫ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। অভিযোগ ছিল, অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরে সাব্বিরকে মাথায় আঘাতের পর ছাদ থেকে ফেলে হত্যা করা হয়।
মামলাটি বিচারের জন্য ঢাকার ৪ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরিত হয় (মামলা নং- ০৭/২০১১)। ২০১১ সালের ১৫ ডিসেম্বর তৎকালীন বিচারক মো. মোতাহের হোসেন মামলার রায় ঘোষণা করেন। রাষ্ট্রপক্ষ ঘটনার পক্ষে কোনো প্রত্যক্ষ বা বস্তুনিষ্ঠ সাক্ষী উপস্থাপন করতে না পারায় প্রধান আসামি সাফিয়াত সোবহান সানভীর ও শামসুদ্দিন আহমেদসহ ৫ আসামির সবাইকেই বেকসুর খালাস দেওয়া হয়।
নিম্ন আদালতের এই খালাসের রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ হাইকোর্টে আপিল দায়ের করে। ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে হাইকোর্ট বিভাগ এক রুলে জানতে চান—”আসামিদের দেওয়া খালাসের রায় কেন বাতিল করা হবে না?একই সাথে খালাসপ্রাপ্ত আসামিদের নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল । বর্তমানে এই রুল ও আপিলটি হাইকোর্ট বিভাগে চূড়ান্ত শুনানির অপেক্ষায় বিচারাধীন রয়েছে ।
হত্যাকাণ্ডটি ধামাচাপা দিতে তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকারের উচ্চপর্যায়ে ২১ কোটি টাকা ঘুষ লেনদেনের অভিযোগে ২০০৭ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) একটি আলাদা মামলা করে (রমনা থানা মামলা নং- ০৫(১০)২০০৭)। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০২৫ সালের ২০ মার্চ ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৩ এই ঘুষের মামলা থেকে তারেক রহমান ও লুৎফুজ্জামান বাবরসহ সকল আসামিকে বেকসুর খালাস প্রদান করে । এছাড়া ২০২৪ সালে মামলার এক আসামির স্বীকারোক্তিমূলক ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়লে ঘটনাটি আবারও নতুন করে আলোচনায় আসে।
ঘটনা –২
২০০৬ সালে বাংলাদেশের দুই শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী বসুন্ধরা গ্রুপ ও যমুনা গ্রুপের মধ্যকার করপোরেট দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করে। সেই রেষারেষির অংশ হিসেবে ২০০৬ সালের ১৬ আগস্ট বসুন্ধরা গ্রুপের তৎকালীন সিনিয়র ডিরেক্টর (বর্তমান পূর্বায়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান) শামসুদ্দিন আহমেদ বাদী হয়ে ঢাকার বাড্ডা থানায় যমুনা গ্রুপের শীর্ষ কর্তাদের বিরুদ্ধে একটি অপহরণের মামলা দায়ের করেন।
মামলায় যমুনা গ্রুপের তৎকালীন চেয়ারম্যান মো. নুরুল ইসলাম বাবুল, তাঁর ছেলে শামীম ইসলাম এবং জামাতা এস এম ওয়াদুদকে আসামি করা হয়। শামসুদ্দিন আহমেদ তাঁর এজাহারে অভিযোগ করেন যে, ১৫ আগস্ট ২০০৬ তারিখে নুরুল ইসলাম বাবুলের নির্দেশে তাঁর ছেলে ও জামাতা মিলে বসুন্ধরা গ্রুপের একজন নিরাপত্তা কর্মী (সিকিউরিটি গার্ড) জাহিদ হোসেনকে অপহরণ করেছেন। দাবি করা হয়েছিল, জাহিদ হোসেন যমুনা গ্রুপের বিরুদ্ধে চলমান অন্য একটি মামলার অন্যতম প্রধান সাক্ষী ছিলেন।
দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া ও তদন্ত শেষে মামলাটি ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (CMM) আদালতে শুনানির জন্য ওঠে। ২০১১ সালের এপ্রিল মাসে ঢাকার দ্বিতীয় অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আবু জাফর মোহাম্মদ কামরুজ্জামান মামলার নথিপত্র ও সাক্ষ্যপ্রমাণ পর্যালোচনা করেন। আদালত দেখতে পান যে, অপহরণের পুরো অভিযোগটি সম্পূর্ণ সাজানো, কাল্পনিক এবং ভিত্তিহীন। অভিযোগের কোনো সত্যতা না পাওয়ায় আদালত যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যানসহ তিন আসামিকে মামলা থেকে পুরোপুরি অব্যাহতি দেন।
বিশিষ্ট ব্যক্তিদের হেনস্তা এবং আদালতের মূল্যবান সময় নষ্ট করার অপরাধে আদালত শামসুদ্দিন আহমেদের ওপর চরম অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। ২০১১ সালের ৬ এপ্রিল আদালত তাঁকে কারণ দর্শানোর (Show-Cause) নোটিশ দেন। তাঁর লিখিত জবাব আদালতের কাছে গ্রহণযোগ্য মনে না হওয়ায়, ২০১১ সালের ১২ এপ্রিল আদালত দণ্ডবিধির ২১১ ধারা (মিথ্যা মামলা দায়েরের অপরাধ) অনুযায়ী শামসুদ্দিন আহমেদকে ৩০ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং ১,০০০ টাকা জরিমানা (অনাদায়ে আরও ৩০ দিনের জেল) প্রদান করেন। একই সাথে তাঁর বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা (Conviction Warrant) জারি করে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

