
আব্দুর রাজ্জাক
রাজধানীর বনানী চেয়ারম্যান বাড়ি সংলগ্ন সেতু ভবনের সামনে আবারও ঝরল তাজা প্রাণ। এবার ‘ভূঁইয়া পরিবহন’-এর একটি বেপরোয়া বাসের ধাক্কায় প্রাণ হারিয়েছেন দুই পথচারী। গত কয়েক বছর ধরেই বনানীর এই নির্দিষ্ট অংশটি যমদূত হয়ে দাঁড়িয়েছে সাধারণ মানুষের জন্য, যা বর্তমানে রাজধানীর অন্যতম প্রধান ‘ব্ল্যাক স্পট’ হিসেবে চিহ্নিত।
আজকের ঘটনার বিবরণ
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আজ বিকেলে বনানী সেতু ভবনের সামনে রাস্তা পার হচ্ছিলেন ওই দুই ব্যক্তি। এসময় দ্রুতগতিতে আসা ভূঁইয়া পরিবহনের একটি বাস তাদের সজোরে ধাক্কা দিলে ঘটনাস্থলেই তাদের মৃত্যু হয়। ঘটনার পরপরই স্থানীয় জনতা ও পথচারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। চালক পালানোর চেষ্টা করলেও ঘাতক বাসটিকে আটকে রাখে উত্তেজিত জনতা।
মৃত্যুপুরী চেয়ারম্যান বাড়ি: এক নজরে গত কয়েক বছরের চিত্র
বনানী থেকে মহাখালী অভিমুখী এই ঢালু রাস্তাটি গত পাঁচ বছরে অন্তত ২০ জন মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, এই এলাকায় দুর্ঘটনার মিছিল থামছেই না:
১০ মার্চ ২০২৫: ভোরে রাস্তা পার হওয়ার সময় বাস চাপায় মিনারা আক্তার নামে এক পোশাক শ্রমিক নিহত হন। ওই ঘটনায় শ্রমিকদের সড়ক অবরোধে স্থবির হয়ে পড়েছিল বনানী।
২০২৪-২০২৫: এই এক বছরেই এলাকাটিতে ছোট-বড় অন্তত ১২টি দুর্ঘটনা ঘটেছে, যাতে হতাহতের সংখ্যা ১৫ ছাড়িয়েছে।
২০২২-২০২৩ (ঢাকার প্রেক্ষাপট): আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মতে, গত দুই বছরে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনে ৫৪০ জন সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন, যার মধ্যে ৫৬% ছিলেন পথচারী। বনানীর মতো ব্যস্ত এলাকাগুলোতে এই ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
কেন থামছে না এই মৃত্যুমিছিল?
সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ (নিসচা) এবং ‘যাত্রী কল্যাণ সমিতি’র মতে, বনানী এলাকার এই দুর্ঘটনার পেছনে তিনটি প্রধান কারণ দায়ী:
১. বাসের রেষারেষি: বনানী-মহাখালী রুটে বাসের চালকরা একে অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকে, যা দুর্ঘটনার মূল কারণ।
২. অদক্ষ ও লাইসেন্সহীন চালক: আজকের ঘটনার মতো অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, অদক্ষ হেলপার বা লাইসেন্সহীন চালক দিয়ে গাড়ি চালানোর কারণেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পথচারীদের চাপা দেওয়া হয়।
৩. বিপজ্জনক ক্রসিং: চেয়ারম্যান বাড়ি সংলগ্ন ইউটার্ন ও ঢালু রাস্তায় যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই।
স্থানীয়দের দাবি
বারবার একই জায়গায় মৃত্যুর ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। তাদের দাবি, সেতু ভবনের সামনের এই বিপজ্জনক ঢালু রাস্তায় স্থায়ী গতিরোধক (Speed Breaker) স্থাপন এবং সার্বক্ষণিক ট্রাফিক পুলিশের কঠোর নজরদারি নিশ্চিত না করলে এই মৃত্যুর মিছিল বন্ধ হবে না।
আজকের এই দুই প্রাণহানি যেন শুধু একটি সংখ্যা হয়ে না থাকে, বরং নিরাপদ সড়কের দাবিতে প্রশাসনের টনক নাড়ানোর চূড়ান্ত সংকেত হয়ে দাঁড়ায়—এমনটাই প্রত্যাশা সাধারণ মানুষের।

