
মোঃ নাজমুল ইসলাম সবুজ-শরণখোলা (বাগেরহাট) :
চলমান মৎস্য প্রজনন মৌসুমে পূর্ব সুন্দরবনের অভয়ারণ্যে চোরাশিকারিদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সময়োপযোগী ও কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছে বন বিভাগ। ১ জুন থেকে শুরু হওয়া তিন মাসের নিষেধাজ্ঞার সুফল নিশ্চিতে বনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ১০টি ‘ভাড়ানী’ খালের মুখ মজবুত কাঠের বেড়া দিয়ে পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এই পদক্ষেপের ফলে অবৈধ অনুপ্রবেশ উল্লেখযোগ্য হারে কমার পাশাপাশি মাছের নিরাপদ প্রজনন ও উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে।
সরেজমিনে সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের দাশের ভাড়ানী খালে গিয়ে দেখা যায়, নৌযান চলাচলের পথ সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ। খালের তলদেশ থেকে প্রায় ২০ ফুট উঁচু করে খাড়া ও আড়াআড়িভাবে শক্ত কাঠের খুঁটি পুঁতে লোহার পেরেক দিয়ে এই মজবুত বেড়া তৈরি করা হয়েছে। তবে এই বেড়া এমন সুকৌশলে নির্মাণ করা হয়েছে যে, পানির স্বাভাবিক প্রবাহ এবং মাছ ও জলজ প্রাণীর চলাচল একেবারেই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে না; কেবল বনের ভেতরে নৌকা প্রবেশের পথ বন্ধ করা হয়েছে।
বন বিভাগের তথ্যমতে, ভাড়ানী খালগুলো মূলত সুন্দরবনের জালের মতো ছড়িয়ে থাকা শাখা-প্রশাখা খালগুলোর প্রধান সংযোগপথ। এগুলো বন্ধ থাকায় জলপথে অপরাধীদের বনের গহিনে অনুপ্রবেশ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই ও শরণখোলা রেঞ্জের আওতাধীন মোট ১০টি ভাড়ানী খালের মুখ বন্ধ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে লাউডোব ফাঁড়ির আওতাধীন মরা ভদ্রার ভাড়ানী; ঘাগড়ামারী ফাঁড়ির জিয়ার ভাড়ানী ও খালেকের ভাড়ানী; ঢাংমারী স্টেশনের হুলার ভাড়ানী ও নওশেরখালী ভাড়ানী; করমজল স্টেশনের চারাখালী ও ৮ নম্বর খালের ভাড়ানী এবং নন্দবালা ফাঁড়ির আওতাধীন সূর্যমুখী খাল। শরণখোলা রেঞ্জের খাল ভোলা খাল এবং দাশের ভাড়ানী খাল।
শরণখোলা ফরেস্ট রেঞ্জ কর্মকর্তা ও সহকারী বন সংরক্ষক মো. শরীফুল ইসলাম জানান, প্রতি বছর ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনে মাছ ও কাঁকড়া আহরণসহ পর্যটক প্রবেশে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা থাকে। এই সুযোগে কিছু অসাধু চক্র গোপনে বনাঞ্চলে ঢুকে জাল, বিষ এবং স্থানীয় ‘চড়গড়া’ পদ্ধতিতে ডিমওয়ালা মা-মাছ ও পোনা নিধন করে। এসব অপরাধীদের প্রধান রুট ছিল ভাড়ানী খালগুলো, যা এখন বেড়া দিয়ে সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় জেলেরাও বন বিভাগের এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তারা জানান, প্রজনন মৌসুমে এসব খালে বড় বড় মা-মাছ ডিম ছাড়ে। আগে চোরাশিকারিরা সহজেই এখানে হানা দিত। এখন তাদের প্রবেশ কঠিন হওয়ায় মাছের নির্বিঘ্ন প্রজনন নিশ্চিত হচ্ছে, যার ফলে ভবিষ্যতে মাছের উৎপাদন বাড়লে জেলেরাই আর্থিকভাবে লাভবান হবেন।
পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী এই উদ্যোগের সফলতা সম্পর্কে বলেন, “খালের মুখ বন্ধ করার পর থেকে সুন্দরবনে অভয়ারণ্যে অপরাধের মাত্রা দৃশ্যমানভাবে কমেছে। মাছের প্রজনন ও সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি বনের সামগ্রিক জলজ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে এর অত্যন্ত ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।”
এছাড়া, বিষ প্রয়োগে মাছ শিকার ও অসাধু উপায়ে মাছ বিক্রি সম্পূর্ণ নির্মূল করতে সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকাগুলোতে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।

