
মোঃ জিমু
ষষ্ঠ শ্রেণি পাস এক এসি মেকানিক থেকে কয়েক কোটি টাকার রিসোর্টের মালিক—অথবা গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে বিশাল মন্দির কমপ্লেক্সের প্রতিষ্ঠাতা। একজন মানুষের জীবনে এত দ্রুত এবং এত নাটকীয় রূপান্তর কি কেবলই মেধার স্বাক্ষর, নাকি এর পেছনে রয়েছে কোনো সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র? দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নথিভুক্ত প্রতারক হরিদাস চন্দ্র তরনীদাস ওরফে তাওহীদ ইসলামের উত্থান ও কর্মকাণ্ড বর্তমানে জনমনে বড় ধরনের প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করেছে।
প্রতারণার হাতেখড়ি ও উত্থান
২০২২ সালের ৭ নভেম্বর র্যাব-৩ ও এনএসআইয়ের হাতে গ্রেফতার হওয়ার সময় তার পরিচয় ছিল ‘তাওহীদ ইসলাম’। বগুড়ার শিবগঞ্জের সন্তান হরিদাসের আসল নাম হরিদাস চন্দ্র তরনীদাস। অভিযোগ রয়েছে, ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর ভারতে গিয়ে ইলেকট্রনিক্সে প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে ফিরে সে এসি মেকানিকের কাজ শুরু করে। এক বছরের ব্যবধানে ধর্ম পরিবর্তন করে শুরু করে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু ব্যবহার করে প্রতারণার জাল। প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের নাম ভাঙিয়ে, এডিট করা ছবি ও নকল ডিও লেটার ব্যবহার করে শত শত মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নেয় প্রায় ৫ কোটি টাকা। সেই টাকায় ময়মনসিংহে গড়ে তোলে ৩ কোটি টাকার রিসোর্ট।
মন্দির ঘিরে রহস্যের জাল
কারাগার থেকে বের হওয়ার পর হরিদাসের নতুন মঞ্চ এখন গাইবান্ধার পলাশবাড়ী। সেখানে প্রায় ৭৬ শতাংশ জমিতে গড়ে তুলেছে শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ ও কালী মন্দির কমপ্লেক্স, যেখানে রয়েছে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ শ্রীকৃষ্ণের বিগ্রহ। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় হয়েছে ২০ থেকে ৪০ কোটি টাকা। অথচ হরিদাসের দাবি, এই বিপুল অর্থ তার নিজস্ব। আবার অন্য গণমাধ্যমের কাছে সে একে ‘ভক্তদের দান’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। অর্থের এই ভিন্ন ভিন্ন উৎস নিয়ে স্থানীয় জনগণ ও বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠনের মনে সৃষ্টি হয়েছে গভীর সংশয়।
কূটনৈতিক উপস্থিতি ও রাজনৈতিক হুঙ্কার
ঘটনার জটিলতা আরও বাড়ে যখন গত ২৫ নভেম্বর রাজশাহীতে নিযুক্ত ভারতীয় সহকারী হাই কমিশনার মনোজ কুমার সশরীরে গিয়ে এই মন্দির উদ্বোধন করেন। একজন বিতর্কিত ও মামলাভুক্ত ব্যক্তির ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানে একজন বিদেশি কূটনীতিকের উপস্থিতি সচেতন মহলে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
এরই মধ্যে হিন্দু নেতা পলাশ কান্তি দে’র সাম্প্রতিক বিতর্কিত বক্তব্য আগুনে ঘি ঢেলেছে। রাজু ভাস্কর্যের সামনে তিনি রামমন্দির নির্মাণের পক্ষে যে আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়েছেন এবং ‘ঢাকা অচল’ করার হুমকি দিয়েছেন, তা এই মন্দির প্রকল্পকে কেবল ধর্মীয় স্থাপনা নয়, বরং একটি রাজনৈতিক এজেন্ডার অংশ হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
মিডিয়ার ভূমিকা ও পেশাদারিত্ব নিয়ে প্রশ্ন
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, যে গণমাধ্যমগুলো ২০২২ সালে হরিদাসের প্রতারণার সংবাদ গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করেছিল, তারাই এখন তাকে ‘রূপান্তরের জাদুকর’ বা ‘সমাজসেবক’ হিসেবে তুলে ধরছে। প্রতারণার ইতিহাস আড়াল করে এভাবে ইতিবাচক বয়ান তৈরি করা সাংবাদিকতার নীতিমালার সাথে সাংঘর্ষিক কি না, তা নিয়ে বিতর্ক উঠছে।
অথচ, এই পুরো প্রক্রিয়ায় কথিত সুশীল সমাজ ও অডিট নিয়ে সোচ্চার গোষ্ঠীগুলোর রহস্যময় নীরবতা প্রশ্নটিকে আরও জোরালো করেছে। কেন একজন প্রমাণিত প্রতারকের তৈরি প্রকল্পের পেছনে এত প্রভাবশালী মহল বিনিয়োগ করছে বা রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে—সেই উত্তর খুঁজছে সাধারণ মানুষ।
তথ্য ও উপাত্তগুলো কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং একটি বড় কৌশলের অংশ কি না—এখন সেই মূল প্রশ্নটির উত্তর খুঁজছে সচেতন মহল। হরিদাস কি কেবলই এক প্রতারক, নাকি সে কোনো অদৃশ্য শক্তির হাতের পুতুল? এই উত্তর মিললেই বেরিয়ে আসবে নেপথ্যের আসল ষড়যন্ত্র।

