
আসাদুল্লাহ হাদিস ,
মানুষ মানুষের জন্য—এই চিরন্তন সত্যকেই যেন বাস্তবে রূপ দিল স্টুডেন্ট কমিউনিটি ঢাকাস্থ আঠারবাড়ি। তাদের উদ্যোগে ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার আঠারবাড়ি ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সহিলাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে দিনব্যাপী সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসা ও রক্তের গ্রুপ নির্ণয় ক্যাম্প। সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চলা এই মানবিক আয়োজনে গ্রামের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার শত শত মানুষ চিকিৎসাসেবা নিতে ভিড় করেন।
যেখানে অর্থের অভাবে অনেক মানুষ বছরের পর বছর চিকিৎসকের কাছে যেতে পারেন না, সেখানে এই ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প যেন তাদের জন্য হয়ে ওঠে এক টুকরো স্বস্তি ও আশার আলো। শিশু থেকে বৃদ্ধ—সব বয়সী মানুষের মুখে ছিল স্বস্তির হাসি, চোখে ছিল কৃতজ্ঞতার ছাপ।
এই মহতী আয়োজনের সার্বিক সহযোগিতায় ছিলেন খিলগাঁও মডেল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক মাহফুজুল ইসলাম ভূঁইয়া মামুন। তিনি বলেন,
”আমাদের এলাকায় অসংখ্য অসহায়, বঞ্চিত ও নিম্ন আয়ের মানুষ রয়েছেন, যারা শুধুমাত্র টাকার অভাবে চিকিৎসাসেবা নিতে পারেন না। তাদের কষ্টের কথা চিন্তা করেই আমরা এই বিনামূল্যে চিকিৎসা ক্যাম্পের আয়োজন করেছি। পাশাপাশি ছোট ছোট শিক্ষার্থীরা যেন নিজেদের রক্তের গ্রুপ জানতে পারে, সেই লক্ষ্যেও বিনামূল্যে রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করা হচ্ছে।”
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান,
”এটি একদিনের কর্মসূচি নয়। আঠারবাড়ি ইউনিয়নের প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং আশপাশের গ্রামের অসহায় মানুষের কাছে এই চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে আমরা দীর্ঘমেয়াদিভাবে কাজ করতে চাই। মানুষের পাশে থাকার এই উদ্যোগ ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে, ইনশাআল্লাহ।”
চিকিৎসাসেবা নিতে আসা হাছু মিয়া আবেগঘন কণ্ঠে বলেন,
”আমার চোখের সমস্যা অনেক দিন ধরে। চিকিৎসার জন্য ময়মনসিংহ যাওয়ার কথা ভাবছিলাম, কিন্তু টাকার অভাবে যেতে পারিনি। পরে শুনলাম এখানে বিনা টাকায় ডাক্তার দেখানো হচ্ছে। তাই চলে এসেছি। এমন উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। আমি মামুন বাবার জন্য দোয়া করি, আল্লাহ যেন তাকে দীর্ঘ নেক হায়াত দান করেন এবং সব সময় গরিব মানুষের পাশে থাকার তৌফিক দেন।”
আরেক সেবাগ্রহীতা সাহারা বানু বলেন,
”আমার সারা শরীরে ব্যথা। গরিব মানুষ, টাকার অভাবে ডাক্তার দেখাতে পারি না। যখন শুনলাম এখানে বিনা টাকায় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে, তখনই চলে আসি। এত সুন্দরভাবে চিকিৎসা পেয়ে আমি খুব খুশি।”
শুধু বয়স্করাই নন, শিক্ষার্থীদের মধ্যেও ছিল ব্যাপক উৎসাহ। সহিলাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী ফাতিয়া জান্নাত তুয়া প্রথমবারের মতো নিজের রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করে আনন্দ প্রকাশ করে বলে,
”আজ আমি জানতে পারলাম আমার রক্তের গ্রুপ কী। এত সুন্দর আয়োজন আমি আগে কখনো দেখিনি। খুব ভালো লাগছে।”
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকও আয়োজকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন,
”এ ধরনের মানবিক উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়। গ্রামের অসহায় মানুষ এবং আমাদের বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আজ বিনামূল্যে চিকিৎসা ও রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করার সুযোগ পেয়েছে। সমাজের বিত্তবান ও সচেতন মানুষ যদি এভাবে এগিয়ে আসেন, তাহলে গ্রামের অসহায় মানুষের অনেক কষ্ট লাঘব হবে।”
গ্রামের সাধারণ মানুষের চোখে-মুখে স্বস্তি, শিশুদের উচ্ছ্বাস আর প্রবীণদের দোয়া—সব মিলিয়ে দিনটি ছিল মানবতার এক অনন্য উদাহরণ। সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে তরুণদের এমন উদ্যোগ নিঃসন্দেহে অন্যদেরও মানবসেবায় এগিয়ে আসতে অনুপ্রাণিত করবে। কারণ, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেয়ে বড় কোনো মানবিক কাজ নেই।

