
মো.আবু সালেক ভূইয়া ভ্রাম্যমান প্রতিনিধি
গাজীপুর মহানগরের চান্দনা চৌরাস্তার একটি আবাসিক হোটেল থেকে গার্মেন্টসকর্মী শান্তা বেগমের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনের দ করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন—পিবিআই।
এ ঘটনায় নিহতের স্বামী ও মামলার প্রধান আসামি মো. সাইফুল ইসলামকে ঢাকার দক্ষিণখান এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার কাছ থেকে শান্তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনও উদ্ধার করেছে তদন্ত সংস্থাটি।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) গাজীপুরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পিবিআই গাজীপুর জেলার পুলিশ সুপার মো. রকিবুল আক্তার এসব তথ্য জানান।
তিনি বলেন, গ্রেপ্তার সাইফুল ইসলামকে আদালতে হাজির করা হলে তিনি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার বিষয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
নিহত মোসা. শান্তা বেগম নাটোর সদর উপজেলার চরলক্ষীকোল গ্রামের শহিদুল ইসলামের মেয়ে। তিনি গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার সফিপুর আহমেদনগর এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন এবং একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। দুই সন্তানের জননী শান্তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলা ও বুকে আঘাত করে হত্যা করা হয় বলে জানিয়েছে পিবিআই।
স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে হোটেলে ওঠেন----
পিবিআইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, ২১ জুলাই দুপুর আনুমানিক ১টা ৪৮ মিনিটে শান্তা বেগম ও সাইফুল ইসলাম স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে চান্দনা চৌরাস্তার ‘আনোয়ারা ম্যানশন’ ভবনে অবস্থিত ইভ্যালি আবাসিক হোটেলে ওঠেন। তারা হোটেলের তৃতীয় তলার ৩০৭ নম্বর কক্ষ ভাড়া নেন।
ওই দিন রাত আনুমানিক ১০টা ৪৮ মিনিটে হোটেল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে খবর পেয়ে বাসন থানা-পুলিশ কক্ষটির ভেতর থেকে শান্তার মরদেহ উদ্ধার করে। তার গলা ও বুকে ধারালো অস্ত্রের একাধিক আঘাতের চিহ্ন ছিল। তবে ওই সময় কক্ষে সাইফুলকে পাওয়া যায়নি।
প্রথমে নিহত নারীর পরিচয় জানা যায়নি। খবর পেয়ে পিবিআই গাজীপুর জেলার ক্রাইমসিন টিম ঘটনাস্থলে গিয়ে আঙুলের ছাপসহ বিভিন্ন তথ্যপ্রযুক্তি ও অনুসন্ধানী পদ্ধতি ব্যবহার করে তার পরিচয় শনাক্ত করে।
পরে নিহতের বাবা মো. শহিদুল ইসলাম বাদী হয়ে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে বাসন থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলাটি দণ্ডবিধির ৩০২ ও ৩৪ ধারায় রেকর্ড করা হয়।
পিবিআইয়ের তফসিলভুক্ত মামলা হওয়ায় ২৩ জুলাই সংস্থাটি স্বপ্রণোদিত হয়ে তদন্তভার গ্রহণ করে। পুলিশ পরিদর্শক মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান আনসারীকে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়।
ফায়দাবাদ থেকে গ্রেপ্তার----- পিবিআই জানায়, হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই গাজীপুর জেলার একটি দল ছায়া তদন্ত শুরু করে। হোটেলের নিবন্ধন তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ, প্রযুক্তিনির্ভর অনুসন্ধান এবং বিভিন্ন সূত্রের তথ্য বিশ্লেষণ করে সাইফুলের অবস্থান শনাক্ত করা হয়।
২৩ জুলাই সকাল সাড়ে ৭টার দিকে ঢাকা মহানগর পুলিশের দক্ষিণখান থানাধীন ফায়দাবাদের ট্রান্সমিটার মোড় এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তল্লাশির সময় তার কাছ থেকে নিহত শান্তা বেগমের মোবাইল ফোন উদ্ধার করে জব্দ করা হয়।
পিবিআই প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. মোস্তফা কামালের নির্দেশনা এবং গাজীপুর জেলার পুলিশ সুপার মো. রকিবুল আক্তারের তত্ত্বাবধানে অভিযানটি পরিচালিত হয় বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
সন্দেহ ও দাম্পত্য কলহ----
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও আদালতে দেওয়া জবানবন্দির বরাতে পিবিআই জানায়, গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানায় কাজ করার সময় সাইফুলের সঙ্গে শান্তার পরিচয় ও সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সম্পর্কের প্রায় তিন মাস পর তারা বিয়ে করেন। তবে আগের সংসার, সন্তান এবং পারিবারিক বিভিন্ন তথ্য নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের দাবি, সাইফুলের আগের সংসারে দুই ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে। অন্যদিকে শান্তারও আগের সংসারের দুই সন্তান ছিল। বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই পারস্পরিক অবিশ্বাস, সন্দেহ ও দাম্পত্য কলহের কারণে তাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটে।
ঘটনার দিন শান্তা ফোন করে সাইফুলকে গাজীপুরে আসতে বলেন। পরে তারা চান্দনা চৌরাস্তার ওই আবাসিক হোটেলের ৩০৭ নম্বর কক্ষে ওঠেন। সেখানে পুরোনো বিরোধ ও সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়।
পিবিআইয়ের দাবি, একপর্যায়ে উভয়ের মধ্যে হাতাহাতি হয়। সাইফুল শান্তাকে থাপ্পড় দিলে শান্তা তাকে আঁচড় ও আঘাত করেন। এরপর সাইফুল ধারালো ছুরি দিয়ে শান্তার গলা ও বুকে আঘাত করেন। শান্তা খাটের ওপর পড়ে গেলে তার ব্যাগ থেকে মোবাইল ফোন ও পরিচয়পত্র নিয়ে সাইফুল হোটেল থেকে পালিয়ে যান।
তবে হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধার এবং ঘটনার সঙ্গে আর কেউ জড়িত ছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পিবিআই।
‘
বিরামহীন অভিযান প্রচেষ্টায় সাফল্য------
পিবিআই গাজীপুর জেলার পুলিশ সুপার মো. রকিবুল আক্তার সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “অজ্ঞাত নারীর মরদেহ উদ্ধারের সংবাদ পাওয়ার পরপরই ক্রাইমসিন টিমকে ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়। পাশাপাশি আরেকটি দলকে ছায়া তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনায় এবং তদন্ত দলের বিরামহীন প্রচেষ্টায় এক দিনের মধ্যেই নিহতের পরিচয় শনাক্ত, প্রধান আসামিকে গ্রেপ্তার এবং হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব হয়েছে।”
তিনি বলেন, মামলার অন্যান্য আলামত সংগ্রহ, সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। তদন্তে পাওয়া তথ্য ও সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে দ্রুত আদালতে প্রতিবেদন দেওয়া হবে।
গ্রেপ্তার সাইফুল ইসলামকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। আদালতে দেওয়া তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, উদ্ধার করা মোবাইল ফোন, হোটেলের তথ্য ও অন্যান্য আলামত যাচাই করে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে পিবিআই।
।। প্রকাশক ও সম্পাদক : মো: শিহাব উদ্দিন ।। নির্বাহী সম্পাদক : জি.এস. জয় ।। বার্তা-সম্পাদকঃ আবু নাছের
দৈনিক জন জাগরণ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত@২০২৬You cannot copy content of this page