সৌভিক পোদ্দার,
ঝিনাইদহ জেলা শহরের প্রবেশ মুখে কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে নির্মিত বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান চত্বর ও ভাস্কর্য ভেঙে ফেলা হচ্ছে। গত ২(দুই) দিন ধরে শ্রমিকরা চত্বরটি ভাঙছেন। তবে কারা ভাঙছেন, কি কারণে ভাঙছেন, তার নিদিষ্ট কোন কারণ জানতে পারেন নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এই নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ঝিনাইদহ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের সামনে ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহ-যশোর মহাসড়কের প্রবেশমুখে অবস্থিত চত্বরটি ভাঙার কাজ চলছে। শ্রমিকদের কাছে জানতে চাইলে তারা এ বিষয়ে পৌরসভায় যোগাযোগ করতে বলেন।
পথচারী আজিজুল হক বলেন, প্রত্যেকটি শহরের প্রবেশমুখেই জেলার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও ঐতিহ্য নিয়ে ব্র্যান্ডিং ভাস্কর্য বা প্রতিকৃতি রয়েছে।ঝিনাইদহ শহরের প্রবেশমুখে এই স্থানটিতে একটি ভাস্কর্য ছিল। শুনেছি এটি ঝিনাইদহের গর্ব বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের। এখন দেখছি ভেঙে ফেলা হচ্ছে। তবে কেন ভাঙা হচ্ছে আমরা জানি না।
বাসচালক লিয়াকত আলী বলেন, চত্বরটির কারণে সড়কের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের যানবাহন দেখা কঠিন হওয়ায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হতো। তবে তিনি বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের স্মৃতির প্রতি সম্মান রেখে অন্য উপযুক্ত স্থানে প্রতিকৃতি স্থাপনের দাবি জানান।
বীর মুক্তিযোদ্ধা সিদ্দিকুর রহমান বলেন, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান ঝিনাইদহ তথা সারা দেশের গর্ব। তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে নিজের জীবন দিয়ে বীরত্বপূর্ণ ইতিহাস লিখে গেছেন। তাঁর নামে একটি চত্বর থাকলে নতুন প্রজন্ম তাঁর সম্পর্কে জানবে। সেটা যদি জেলার প্রবেশমুখে হয়, তাহলে যেকেউ জেলায় প্রবেশের পথেই তাঁর সম্পর্কে জানতে পারবে।
ভেঙে ফেলার বিষয়ে জানতে চাইলে ঝিনাইদহ পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাশেদ আলী খান বলেন, কেন ভাঙা হচ্ছে তা জানি না। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক বলতে পারবেন।
ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসক মো. নোমান হোসেন বলেন, এটা যে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য তা জানা ছিল না। তা ছাড়া জেলা প্রশাসন ভাঙছে বিষয়টি এমন নয়। তবে এটি ওই জায়গা থেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয় অনেক আগেই। সড়ক ও জনপথ এবং পৌরসভা সেই সিদ্ধান্তই বাস্তবায়ন করছে সম্ভবত। তবে নতুন করে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের একটি প্রতিকৃতি করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি। ভাঙার বিষয়ে তিনি সড়ক ও জনপথ বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঝিনাইদহ সড়ক ও জনপথবিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হাফিজুর রহমান বলেন, কারা কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল থেকে ভাস্কর্য ও চত্বরটি অপসারণ করছে তা আমার জানা নেই।
ঝিনাইদহ পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালের দিকে ঝিনাইদহ পৌরসভার উদ্যোগে প্রায় ১৬ (ষোল) লাখ টাকা ব্যয়ে ঝিনাইদহ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের ঝিনাইদহ-যশোর, ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহ-চুয়াডাঙ্গা লিংক সড়কে ৩০(ত্রিশ) ফুট উচ্চতা ও ১০(দশ) ফুট প্রশস্ত বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান চত্বর নির্মাণ প্রকল্প নেওয়া হয়। কিন্তু কয়েক বছর অতিবাহিত হলেও অজ্ঞাত কারণে ভাস্কর্যটির সম্পূর্ণ কাজ শেষ না করেই ফেলে রাখা হয়। এর মধ্যে দুই দফা মেয়র পরিবর্তন ও দুই দফা প্রশাসক নিয়োগ হলেও এই চত্বরের কাজ শেষ হয়নি। কাজ শেষ না করায় ভাস্কর্যের সম্পূর্ণ আকৃতিও ছিল না। এদিকে দীর্ঘদিন অবহেলায় ফেলে রাখায় চত্বরে সৌন্দর্যবর্ধনের গাছের পরিবর্তে জন্ম নেয় আগাছা।
বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাতিজা হাফিজুর রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘ঝিনাইদহ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকায় আমার চাচা বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল তৎকালীন ঝিনাইদহ পৌরসভা চেয়ারম্যান। সে সময়ের পৌর চেয়ারম্যান আমাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং ভাস্কর্য নির্মাণ শুরুর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানান। আমাদের পরিবারের পক্ষ থেকে আমার ভাই মুস্তাফিজুর রহমান ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু এখন ফেসবুকের মাধ্যমে দেখছি ভাস্কর্যটি ভেঙে ফেলা হচ্ছে। কেন ভাঙা হচ্ছে, কার নির্দেশে ভাঙা হচ্ছে বা কোন দপ্তর এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এসব বিষয়ে আমাদের পরিবারের সঙ্গে কেউ কোনো ধরনের যোগাযোগ করেনি। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক।’
ভাতিজা আরও বলেন, ‘ভাস্কর্যটি যদি সরাতেই হতো, তাহলে অন্তত আমাদের পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করা যেত। কাউকে কিছু না জানিয়ে এভাবে ভাস্কর্য অপসারণ করা এটি বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের প্রতি অসম্মান প্রদর্শনের শামিল। একই সঙ্গে আমাদের পরিবারের সদস্যদেরও অবমাননা করা হয়েছে। আমরা এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।’
।। প্রকাশক ও সম্পাদক : মো: শিহাব উদ্দিন ।। নির্বাহী সম্পাদক : জি.এস. জয় ।। বার্তা-সম্পাদকঃ আবু নাছের
দৈনিক জন জাগরণ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত@২০২৬You cannot copy content of this page