
স্টাফ রিপোর্টার :
রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে একাধিক মাদক মামলার আসামি এবং একটি মামলায় ৩০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত এক ব্যক্তির প্রকাশ্যে চলাফেরা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানের পরও তিনি এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে চলেছেন।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন গোদাগাড়ী পৌরসভার মহিশালবাড়ী সাগরপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল কালাম আজাদ (৫০)। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে তিনি সীমান্তকেন্দ্রিক মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, সীমান্ত এলাকায় একসময় ভারতীয় চিনি বহনের কাজ করতেন আব্দুল কালাম আজাদ। পরে তিনি মাদক পরিবহনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন এবং ধীরে ধীরে নিজেই একটি মাদক চক্র নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেন। এলাকাবাসীর ভাষ্য, এই ব্যবসার মাধ্যমে অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। তবে এসব দাবির স্বাধীন যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সংগ্রহ করা মামলা-সংক্রান্ত নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত তিন দশকে তার বিরুদ্ধে অন্তত সাতটি মাদক মামলা হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে এবং একটি মামলায় আদালত তাকে ৩০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, তিনি বর্তমানে ওই মামলায় জামিনে রয়েছেন।
নথি অনুযায়ী, ১৯৯১ সালে রাজশাহীর কাশিয়াডাঙ্গা এলাকায় তৎকালীন বিডিআরের হাতে ২০০ গ্রাম হেরোইনসহ গ্রেপ্তার হন। ১৯৯৩ সালে ঢাকার গাবতলীর একটি আবাসিক হোটেল থেকে হেরোইনসহ আটক হন। ২০০১ সালে সাভারে এক কেজি হেরোইনসহ ডিবি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। এছাড়া বর্তমানে তার বিরুদ্ধে আরও চারটি মাদক মামলা বিচারাধীন রয়েছে বলে জানা গেছে।
বিচারাধীন মামলাগুলোর মধ্যে রয়েছে— ২০ মে ২০১৫ সালে আশুলিয়ায় র্যাবের হাতে ১ হাজার ৪০০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার (মামলা নং-৩০), ২০ মে ২০১৬ সালে সাভারে ডিবি পুলিশের হাতে ৪ হাজার পিস ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার (মামলা নং-২২/১১৯), ১৫ আগস্ট ২০১৭ সালে ঢাকার লালবাগে একটি ফ্ল্যাট থেকে ১৪ হাজার ৬০০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার (মামলা নং-৩০/৩৬২) এবং ১৬ মার্চ ২০২৩ সালে গোদাগাড়ী থানায় ৭০০ গ্রাম হেরোইন উদ্ধারের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলা (মামলা নং-৩১)।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক এলাকাবাসী অভিযোগ করেন, একসময় নিম্ন আয়ের পরিবার থেকে উঠে এলেও বর্তমানে আব্দুল কালাম আজাদের নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, মাদক ব্যবসার অর্থে তিনি সাহাব্দীপুর এলাকায় ‘মা ব্রিকস’ নামে একটি ইটভাটা স্থাপন করেছেন। এছাড়া জলাহার মৌজায় কৃষিজমি, একটি পুরোনো বাড়িসহ জমি কিনেছেন বলেও দাবি তাদের। মহিশালবাড়ী-সাগরপাড়া এলাকায় পৈত্রিক ভিটায় প্রায় অর্ধকোটি টাকা ব্যয়ে একটি নতুন বাড়ি নির্মাণ করছেন, যা এখনো অসম্পূর্ণ রয়েছে বলে জানান তারা।
এলাকাবাসীর আরও দাবি, মহিশালবাড়ী গোরস্থান মার্কেটে প্রায় ২৬ লাখ টাকা ব্যয়ে দুটি দোকান, দুটি দামি মোটরসাইকেল, ঢাকায় একটি ফ্ল্যাট এবং নামে-বেনামে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা নগদ অর্থ রয়েছে তার। তবে এসব সম্পদের মালিকানা ও অর্থের উৎস সম্পর্কে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হয়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্পদের উৎস অনুসন্ধান করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে। তাদের ভাষ্য, প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় বড় মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে অনেক সময় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। মামলা ও সাজা হলেও তারা জামিনে বেরিয়ে আবারও আগের কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন বলেও অভিযোগ করেন তারা।
এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা জানান, মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বললে ভয়ভীতি ও হয়রানির আশঙ্কা থাকে। এ কারণে অনেকেই পরিচয় প্রকাশ করে বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
অভিযোগের বিষয়ে আব্দুল কালাম আজাদের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
গোদাগাড়ী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান বলেন, “মাদকবিরোধী অভিযান চলমান রয়েছে। ডিবি, পুলিশ, র্যাব ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সমন্বিতভাবে কাজ করছে। বড় পর্যায়ের অভিযুক্তদের বিরুদ্ধেও আইনগত সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
রাজশাহী জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মেহেদী হাসান বলেন, “মাদক কারবারিদের নতুন করে তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে। আমাদের তালিকায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাম রয়েছে। অভিযানের পাশাপাশি অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে গোদাগাড়ীর দুই মাদক কারবারির সম্পত্তি ক্রোক করা হয়েছে।”
।। প্রকাশক ও সম্পাদক : মো: শিহাব উদ্দিন ।। নির্বাহী সম্পাদক : জি.এস. জয় ।। বার্তা-সম্পাদকঃ আবু নাছের
দৈনিক জন জাগরণ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত@২০২৬You cannot copy content of this page