মেহেদী হাসান শাওন-আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি :
বিশ্ব রাজনীতির মানচিত্রে গত কয়েক দশকে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি হলো চীনের অভূতপূর্ব উত্থান। একসময়ের কৃষিনির্ভর ও অপেক্ষাকৃত দরিদ্র দেশ আজ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি, প্রযুক্তিগত শক্তি এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির প্রধান খেলোয়াড়। এই রূপান্তরের পেছনে কী ধরনের রাজনৈতিক দর্শন, রাষ্ট্র পরিচালনার কৌশল এবং উন্নয়ন ভাবনা কাজ করেছে—সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে চীনের প্রেসিডেন্ট Xi Jinping-এর The Governance of China বইটির দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
এই বই কেবল একজন রাষ্ট্রনেতার বক্তব্যের সংকলন নয়; বরং আধুনিক চীনের আত্মপরিচয়, রাষ্ট্রচিন্তা এবং ভবিষ্যৎ লক্ষ্য সম্পর্কে একটি সুসংগঠিত দলিল। এতে ভাষণ, প্রবন্ধ, সাক্ষাৎকার এবং নীতিগত ব্যাখ্যার মাধ্যমে এমন এক রাষ্ট্রব্যবস্থার ছবি তুলে ধরা হয়েছে, যা পশ্চিমা উদার গণতন্ত্রের পথ অনুসরণ না করেও উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের দাবি করে।
বইটির অন্যতম কেন্দ্রীয় ধারণা হলো “চীনা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন সমাজতন্ত্র”। এই ধারণার মূল বক্তব্য হচ্ছে, সমাজতন্ত্রের মৌলিক কাঠামো বজায় রেখেও বাজার অর্থনীতির বিভিন্ন উপাদানকে ব্যবহার করা সম্ভব। চীন গত চার দশকে যে অর্থনৈতিক সংস্কার ও উন্মুক্তকরণের পথ অনুসরণ করেছে, তা এই দর্শনের বাস্তব প্রয়োগ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। এখানে রাষ্ট্রকে অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক ও দিকনির্দেশক শক্তি হিসেবে দেখা হয়, কিন্তু একই সঙ্গে বেসরকারি উদ্যোগ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্যও সুযোগ সৃষ্টি করা হয়।
পশ্চিমা অর্থনৈতিক তত্ত্বে দীর্ঘদিন ধরে ধারণা ছিল যে বাজার অর্থনীতির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক উদারীকরণও অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু চীনের অভিজ্ঞতা সেই ধারণাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। বইটিতে বারবার জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে উন্নয়নের জন্য প্রতিটি দেশের নিজস্ব বাস্তবতা, ইতিহাস এবং সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যকে গুরুত্ব দিতে হবে। চীনের নেতৃত্ব মনে করে, তাদের দেশের স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য শক্তিশালী কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব অপরিহার্য।
গ্রন্থটিতে দারিদ্র্য বিমোচনকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। চীন কয়েক দশকের মধ্যে শত শত মিলিয়ন মানুষকে দারিদ্র্যসীমার ওপরে তুলতে সক্ষম হয়েছে বলে দাবি করে। অবকাঠামো নির্মাণ, শিল্পায়ন, শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং গ্রামীণ উন্নয়নের মাধ্যমে এই পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে বলে বইটিতে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। উন্নয়নশীল বিশ্বের অনেক দেশের কাছে এই অভিজ্ঞতা আকর্ষণীয়, কারণ তারা দ্রুত অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য বিকল্প মডেল খুঁজছে।
তবে বইটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তাগুলোর একটি হলো রাষ্ট্র ও দলের সম্পর্ক। চীনের শাসনব্যবস্থায় Chinese Communist Party-কে জাতীয় উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। দলীয় নেতৃত্বকে কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস নয়, বরং সামাজিক স্থিতিশীলতা ও জাতীয় ঐক্যের রক্ষক হিসেবেও দেখানো হয়েছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি পশ্চিমা বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে স্পষ্ট বৈপরীত্য সৃষ্টি করে।
বইটিতে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের ওপরও বিস্তৃত আলোচনা রয়েছে। শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান পরিচালিত হয়েছে, যা দেশটির প্রশাসন ও দলীয় কাঠামোর বিভিন্ন স্তরকে প্রভাবিত করেছে। লেখকের মতে, দুর্নীতি রাষ্ট্রের কার্যকারিতা এবং জনগণের আস্থার জন্য বড় হুমকি। ফলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানকে রাজনৈতিক ও নৈতিক উভয় প্রয়োজন হিসেবেই উপস্থাপন করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বইটি তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে এমন একটি বিশ্বব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে যেখানে পারস্পরিক সহযোগিতা, অর্থনৈতিক সংযোগ এবং উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। চীনের বৈশ্বিক অবকাঠামো ও সংযোগভিত্তিক উদ্যোগগুলোকে এই বৃহত্তর দৃষ্টিভঙ্গির অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। চীনের মতে, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সংঘাতের পরিবর্তে সহযোগিতা এবং প্রতিযোগিতার পরিবর্তে যৌথ উন্নয়নকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
তবে একটি সম্পাদকীয় মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বইটির সীমাবদ্ধতা নিয়েও আলোচনা করা জরুরি। এটি মূলত রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা নেতৃত্বের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। ফলে রাজনৈতিক বিরোধিতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, মানবাধিকার বা নাগরিক স্বাধীনতা সম্পর্কিত সমালোচনাগুলো এখানে বিস্তৃতভাবে আলোচিত হয়নি। সমালোচকদের মতে, বইটি চীনের সাফল্য ও রাষ্ট্রদর্শনের শক্তিগুলো তুলে ধরলেও বিতর্কিত প্রশ্নগুলোর ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে নীরব।
অন্যদিকে সমর্থকদের যুক্তি হলো, পশ্চিমা গণতন্ত্রকেন্দ্রিক বিশ্লেষণ প্রায়ই উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মতো বিষয়গুলোকে যথাযথ গুরুত্ব দেয় না। তাদের মতে, চীনের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে উন্নয়নের একটিমাত্র সার্বজনীন পথ নেই। বিভিন্ন দেশ তাদের নিজস্ব বাস্তবতা অনুযায়ী আলাদা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মডেল অনুসরণ করতে পারে।
আসলে ‘দ্য গভর্ন্যান্স অব চায়না’-এর সবচেয়ে বড় গুরুত্ব এখানেই। বইটি কেবল চীনের কথা বলে না; এটি উন্নয়ন, রাষ্ট্রের ভূমিকা, রাজনৈতিক বৈধতা এবং জাতীয় অগ্রগতির প্রশ্নে চলমান বৈশ্বিক বিতর্কের অংশ হয়ে উঠেছে। একদিকে এটি চীনের আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্রদর্শনের প্রকাশ, অন্যদিকে বিশ্ব রাজনীতিতে বিকল্প উন্নয়ন মডেল নিয়ে আলোচনারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
আজ যখন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তিত হচ্ছে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলো নিজেদের জন্য নতুন পথ খুঁজছে, তখন এই বইকে শুধু একটি রাজনৈতিক প্রকাশনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এটি এমন একটি রাষ্ট্রের আত্মপ্রকাশ, যে রাষ্ট্র নিজেকে কেবল আঞ্চলিক শক্তি নয়, বরং বৈশ্বিক ভবিষ্যৎ নির্মাণের অন্যতম অংশীদার হিসেবে দেখতে চায়।
চীনকে বোঝার জন্য চীনের সঙ্গে একমত হওয়া জরুরি নয়। কিন্তু চীনের নেতৃত্ব কীভাবে নিজেদের দেশ, সমাজ ও বিশ্বকে দেখে—তা বোঝার জন্য ‘দ্য গভর্ন্যান্স অব চায়না’ নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠ। আর সেই কারণেই বইটি শুধু রাজনৈতিক গবেষকদের নয়, সাংবাদিক, নীতিনির্ধারক এবং সচেতন পাঠকদের কাছেও বিশেষ মনোযোগের দাবি রাখে।
সব মিলিয়ে, ‘দ্য গভর্ন্যান্স অব চায়না’ আধুনিক চীনের রাজনৈতিক চিন্তা, উন্নয়ন কৌশল এবং রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শন বোঝার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। একমত হোন বা না হোন, বিশ্ব রাজনীতিতে চীনের উত্থানকে বুঝতে আগ্রহী যে কোনো পাঠকের জন্য বইটি আলোচনার দাবিদার।
।। প্রকাশক ও সম্পাদক : মো: শিহাব উদ্দিন ।। নির্বাহী সম্পাদক : জি.এস. জয় ।। বার্তা-সম্পাদকঃ আবু নাছের
দৈনিক জন জাগরণ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত@২০২৬You cannot copy content of this page