প্রিন্ট এর তারিখঃ জুলাই ২৩, ২০২৬, ৩:২২ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ মে ১২, ২০২৬, ৯:৩৪ অপরাহ্ণ
কিশোরগঞ্জে ২০টি সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের মাঝে বিবর্তনের ছাগল উপহার

মোঃ শফিকুল ইসলাম :
অভাবের সংসারে সচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন নিয়ে নতুন এক পথচলা শুরু করেছে ২০টি সুবিধাবঞ্চিত পরিবার। কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার মাথিয়া এলাকায় গ্রামীণ অসহায় ও দুস্থ মানুষকে স্বাবলম্বী করার প্রত্যয়ে শুরু হয়েছে বিশেষ কর্মসূচি ‘ঘুরে দাঁড়াও সমৃদ্ধির পথে’। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘বিবর্তন সামাজিক সংস্থা (বিসাস) এর বিশেষ উদ্যোগে এই পরিবারগুলোর হাতে একটি করে ছাগল তুলে দেওয়া হয়েছে।
মূলত ক্ষুদ্র ঋণের কিস্তির বোঝা এড়িয়ে এবং পরনির্ভরশীলতা কমিয়ে দরিদ্র মানুষকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে সাহায্য করাই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। সাধারণত গ্রামীণ অভাবী মানুষগুলো ঋণের চক্রে আটকে থাকে, কিন্তু বিসাস-এর এই ভিন্নধর্মী উদ্যোগ তাদের মধ্যে নতুন করে আশার আলো জাগিয়েছে। ছাগল পালনের মাধ্যমে নিজেদের পুঁজি গঠন করে তারা ভবিষ্যতে দারিদ্র্যমুক্ত জীবনের স্বপ্ন দেখছেন।
কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার মাথিয়ায় গ্রামীণ অসহায় ও দুস্থ মানুষকে স্বাবলম্বী করার প্রত্যয়ে ‘ঘুরে দাঁড়াও সমৃদ্ধির পথে’ শীর্ষক এক বিশেষ কর্মসূচি শুরু করেছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘বিবর্তন সামাজিক সংস্থা’ (বিসাস)।
মঙ্গলবার (১২ মে) দুপুরে সদর উপজেলার পশ্চিম মাথিয়া স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই কর্মসূচির শুভ উদ্বোধন করা হয়।
বিবর্তন সামাজিক সংস্থা (বিসাস)-এর সভাপতি ফেরদৌস আলমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, কিশোরগঞ্জ জেলা পরিষদ প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেল খান, বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী নবীন দল কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি মো. জহিরুল ইসলাম সোহাগ, গণঅধিকার পরিষদের উচ্চতর পরিষদ সদস্য ও গণমাধ্যম সমন্বয়ক আবু হানিফ,কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি লুৎফর রহমান তালুকদার, পশ্চিম মাথিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক আবু তাহের মিয়াসহ সংগঠনের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
বিবর্তন সংগঠনের এই ‘ছাগল উপহার’ কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো গ্রামীণ দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য একটি টেকসই আয়ের উৎস তৈরি করা। বড় কোনো বিনিয়োগ বা কারিগরি দক্ষতা ছাড়াই ছাগল পালনের মাধ্যমে এই পরিবারগুলো কয়েক বছরের মধ্যে নিজেদের অর্থনৈতিক অবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটাতে পারবে বলে আশা করছে সংগঠনটি।
স্থানীয় এলাকায় বাসিন্দা আরিফুর ইসলাম বলেন, সরকারি সহায়তার পাশাপাশি যদি বেসরকারি ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো এভাবে এগিয়ে আসে, তবে দারিদ্র্য বিমোচন আরও দ্রুত ত্বরান্বিত হবে। ২০টি পরিবারের চোখে এখন শুধু এক চিলতে সুখ আর সচ্ছল আগামীর স্বপ্ন।
"সংগঠনের পক্ষ থেকে এই ছাগল উপহার পেয়ে কামাল হোসেন নামের এক বৃদ্ধ বলেন, আমার মতো সাধারণ মানুষের পাশে এভাবে দাঁড়ানোর জন্য আমি সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ জানাই। আমি এই ছাগলটি যত্ন সহকারে লালন-পালন করার পরিকল্পনা করেছি। আশা করছি, ভবিষ্যতে এটি বাচ্চা দেবে। এর মাধ্যমে আমরা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারব এবং আমাদের সংসার চালানোর ক্ষেত্রে এটি বড় একটি সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।"
ছাগল উপহার পেয়ে আনন্দ প্রকাশ করে রহিমা বেগম বলেন, "সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরায়। নিজের একটা পুঁজি করার স্বপ্ন ছিল দীর্ঘদিনের। বিবর্তন থেকে পাওয়া এই ছাগলটি আমার সেই স্বপ্নের শুরু। ঠিকমতো লালন-পালন করতে পারলে আগামী কোরবানি নাগাদ ভালো একটা অবস্থানে যেতে পারব।"
অনুষ্ঠানে বক্তারা জানান, ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিসাস সামাজিক উন্নয়নে কাজ করে আসছে। এবার সাময়িক ত্রাণের পরিবর্তে দুস্থ পরিবারগুলোকে স্থায়ী আয়ের পথ তৈরি করে দিতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বছর ২০টি অসহায় পরিবারকে একটি করে ছাগল প্রদানের মাধ্যমে তাদের অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
সংস্থার সভাপতি ফেরদৌস আলম বলেন, "প্রতিবছর আমরা কয়েকশ মানুষকে খাদ্য সহায়তা দিতাম, কিন্তু তা বড়জোর দুই-তিন দিনের প্রয়োজন মেটাত। স্থায়ী পরিবর্তনের কথা ভেবেই আমরা এ বছর থেকে ১০-২০ জনকে স্বাবলম্বী করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। মানবিকতাকে পুঁজি করেই আমাদের এই পথচলা।" তিনি সমাজের বিত্তবানদের এই উদ্যোগে শামিল হওয়ার আহ্বান জানান।
গণঅধিকার পরিষদের উচ্চতর পরিষদ সদস্য ও গণমাধ্যম সমন্বয়ক আবু হানিফ বলেন, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘বিবর্তন সামাজিক সংস্থা’ (বিসাস) গত ৮ বছর ধরে যে মানবিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে, তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। বর্তমানে আমাদের সমাজে পারস্পরিক সামাজিক সম্পর্কগুলো ক্রমেই শিথিল হয়ে পড়ছে। আমরা এখন পাশের বাড়ির মানুষের অসহায়ত্ব বা বিপদে আগের মতো এগিয়ে আসি না। বিগত সরকারের সময়ে আমরা দেখেছি, রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে সামাজিক ও প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কগুলো নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। আমাদের মনে রাখা উচিত, আমরা যে রাজনৈতিক দলই করি না কেন, দিনশেষে আমরা একে অপরের প্রতিবেশী। আজ আমার মৃত্যু হলে আমার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষই হয়তো সবার আগে আমার জানাজায় শরিক হবে এই চিরন্তন সত্যটি আমরা ভুলে গিয়েছিলাম।
তিনি আরও বলেন, সামাজিক স্থিতিশীলতা হলো রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার প্রথম ধাপ। পাড়া-মহল্লায় যদি সম্পর্কের অবনতি ঘটে, তবে তার প্রভাব ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের ওপর গিয়ে পড়ে। তাই সরকারের প্রতি আমার আহ্বান থাকবে, সামাজিক এই বন্ধনগুলো যেন কোনোভাবে বাধাগ্রস্ত না হয়। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ের সকল রাজনৈতিক নেতাদের প্রতি অনুরোধ, রাজনৈতিক বিরোধের জেরে কোনো সাধারণ বা অসহায় মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হয়।
পরিশেষে, ‘বিবর্তন সামাজিক সংস্থা’র এই মহতী উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও গতিশীল ও ত্বরান্বিত হবে বলে আমি বিশ্বাস করি। আমার ক্ষুদ্র অবস্থান থেকে এই সংগঠনের সকল ভালো কাজে সব সময় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেব।
অনুষ্ঠানে জেলা পরিষদ প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেল খান এই উদ্যোগের প্রশংসা করে তাৎক্ষণিকভাবে আরও ২৫টি ছাগল প্রদানের ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, "তৃণমূলের নারীদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী করতে এই উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয়। গ্রামের মা-বোনেরা একটি ছাগল পালনকে কেন্দ্র করে বড় স্বপ্ন দেখেন, সেই স্বপ্ন পূরণে আমরাও বিবর্তনের পাশে থাকব।"
।। প্রকাশক ও সম্পাদক : মো: শিহাব উদ্দিন ।। নির্বাহী সম্পাদক : জি.এস. জয় ।। বার্তা-সম্পাদকঃ আবু নাছের
দৈনিক জন জাগরণ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত@২০২৬