সৌভিক পোদ্দার, ঝিনাইদহ
বৈশাখের প্রথম দিন থেকে শুরু হতো মেলা। চলতো পুরো বৈশাখ জুড়ে। মেলায় মিলতো বাতাসাসহ নানা মিষ্টান্ন। বসতো নাগরদোলা, যাত্রাপালা, যাত্রাপার্টি, সার্কাস, বানরের নাচ, বায়োস্কপের দোকান। সকাল থেকে ভিড় জমতো। রাত অবধি মেলা চলতো। মেলার আমেজ উপভোগ করতে দূর-দূরান্ত থেকে আসতো লোকজন। তাদের সঙ্গে আসতো ছোট শিশুরাও।
বৈশাখী মেলার সেই পুরনো আমেজ বা সেই চিরচেনা রূপটি এখন অনেকটাই বিবর্তিত। সময়ের সাথে সাথে উদযাপনের ধরন মেলার মূল চেতনা লোকজ সংস্কৃতি আকর্ষণ এখনো একদম হারিয়ে যায়নি। তবে গ্রাম এবং শহরের মেলা প্রেক্ষাপট এখন ভিন্ন।
সাধারণ বৈশাখের মেলাগুলো বসতো নদীর ঘাট, হাট-বাজার, মন্দির প্রাঙ্গণ কিংবা খোলা মাঠ ছিল মেলার প্রধান কেন্দ্র। বর্তমানে সেই ঐতিহ্য ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে বৈশাখের মেলা। কিন্তু কেন? বৈশাখকে এখন নানা রঙঢঙে পালন করা হলেও কেন সেই মেলা হারিয়ে যাচ্ছে। নেপথ্যের কারণ ও বাস্তবতা কি বলছে?
দৈনিক জাগরনের পহ্ম থেকে দেশের নানা প্রান্তের লোকজনের সঙ্গে কথা এসব কারণ ও বাস্তবতা তুলে আনার চেষ্টা করা হয়েছে।
বৈশাখী মেলা একসময় ছিল বাঙালির জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশের সব জেলাতেই কমবেশি বৈশাখের মেলা বসতো। এসব মেলা স্থায়ী হতো এক থেকে ১৫ (পনেরো) দিন পর্যন্ত।
গ্রামাঞ্চলে এখনো মেলার সেই ঐতিহ্যবাহী মেজাজ কিছুটা টিকে আছে। কিন্তু শহরের মেলা এখন অনেক বেশি সুশৃংখল এবং আধুনিক রূপ নিয়েছে।
আগে মেলা মানে ছিল কুটির শিল্প ও মাটির জিনিসের সমারোহ। এখন সেখানে প্লাস্টিক এবং আধুনিক খেলনা দাপট বেড়েছে।
মেলায় মাটির জিনিস, পুতুল বাঁশ-বেতের সামগ্রী, নকশিকাঁথা, হাতের কাজ, দেশীয় খাবার (মুড়কি, বাতাসা, জিলাপি) মিলতো। আর বিনোদন হিসেবে থাকতো নাগরদোলা, যাত্রাপালা, বায়োস্কোপ ও লাঠিখেলা। সব বয়সী মানুষই ছিল এসব মেলার দর্শনার্থী। কৃষক, জেলে, কামার, কুমার, তাঁতী-গ্রামীণ পেশাজীবীরা যেমন বিক্রেতা ছিলেন, তেমনি শহর থেকেও অনেক মানুষ মেলায় ঘুরতে আসতেন। মেলা ছিল এক অর্থে গ্রামীণ অর্থনীতির বড় কেন্দ্র।
বায়োস্কোপ বা পুতুল নাচের মত পুরনো বিনোদনের জায়গা নিয়েছে কনসার্ট বা ডিজিটাল রাইড।
এক সময় নববর্ষের মূল আকর্ষণ ছিল দোকানের হালখাতা ও মিষ্টি মুখ। শহরে এখন এর চল অনেকটাই কমে গিয়ে অনলাইন শপিং বা ডিসকাউন্ট অফারের দিকে ঝুকে।
ঐতিহ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মেলাগুলো হারিয়ে যাওয়ার নেপথ্যে আরও অনেক কারণ রয়েছে। তার মধ্যে মানুষের মধ্যে কর্ম ব্যস্ততা, ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রভাব, জায়গার সংকুলান, সাংস্কৃতিক পরিবর্তন, অর্থনৈতিক পরিবর্তন ও নিরাপত্তার অভাব।
ঝিনাইদহের বাসিন্দা নুরুননাহার বলেন, আগে আমরা মেলা মানেই আনন্দ বুঝতাম। মেলায় যেতেই হবে। কিন্তু্ এখনকার বাচ্চারা মেলা কি বোঝেই না। তারা মোবাইল ফোন নিয়েই ব্যস্ত। দিনাজপুরের পার্বতীপুরের একটি গ্রামের পল্লী চিকিৎসক অরুণ কুমার রায় বলেন, সেই মেলাগুলো শুধু কেনাকাটার জায়গা ছিল না। এটা ছিল সামাজিক মিলনমেলা। এখন সেই পরিবেশ আর নেই। মেলাও নেই।
তবে এখনও দেশের কিছু অঞ্চলে এই ঐতিহ্য টিকে আছে। সাংস্কৃতিক সংগঠন ও প্রশাসনের উদ্যোগে কিছু মেলা আয়োজন করা হয়, যেখানে নতুন প্রজন্মকে ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত করার চেষ্টা চলছে।
বৈশাখী মেলা কেন হারিয়ে যাচ্ছে তা নিয়ে বিভিন্ন জেলার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মুলত ডিজিটাল যুগের প্রচলন শুরুর পর থেকে মেলাকে বিদায় জানাতে শুরু করেছে লোকজন। বিশেষ করে শহুরে লোকজন। কারণ আগে মেলায় যেসব পণ্য পাওয়া যেতো তা ছিল অনেকটা নিম্মমানের। ফলে স্থায়ী হতো না। আর এখন ঘরে বসেই অনলাইনে অর্ডার করলেই লোকজন সহজে কেনাকাটা করতে পারছে। পাশাপাশি মানুষ এখন প্রচণ্ড ব্যস্ত সময় পার করে। সারাক্ষণ তারা টাকার পেছনে ছুটছে। ফলে আনন্দ বিনোদন করার জন্য মেলায় যাওয়ার মতো লোকজন দিনদিন কমছে। সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো- এসব মেলার আয়োজনের জন্য স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের জায়গা বা নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয় না। ফলে আয়োজকরা নিরুৎসাহিত হয়ে এসব মেলা বন্ধ করে দিচ্ছেন।
।। প্রকাশক ও সম্পাদক : মো: শিহাব উদ্দিন ।। নির্বাহী সম্পাদক : জি.এস. জয় ।। বার্তা-সম্পাদকঃ আবু নাছের
দৈনিক জন জাগরণ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত@২০২৬You cannot copy content of this page