নিজস্ব প্রতিনিধি :
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান-এর দিল্লি সফরকে নিছক আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নতুন করে সংজ্ঞায়িত হওয়ার মুখে দাঁড়িয়ে। তারেক রহমান-এর নেতৃত্বে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর এটিই প্রথম উচ্চপর্যায়ের সফর, যা স্বাভাবিকভাবেই বাড়তি গুরুত্ব পাচ্ছে।
গত দেড় বছরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, তা ছিল প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য- দুই স্তরেই। রাজনৈতিক অস্থিরতা, আস্থার ঘাটতি এবং কিছু সংবেদনশীল ইস্যু দুই দেশের সম্পর্ককে এক ধরনের অস্বস্তিকর দূরত্বে ঠেলে দেয়। বিশেষ করে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সেই সম্পর্কের ভিত্তি নতুন করে প্রশ্নবিদ্ধ হয়। দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠতা যে অনেকটাই ব্যক্তি ও দলনির্ভর হয়ে পড়েছিল- এই সমালোচনাও তখন সামনে আসে।
এই বাস্তবতায় বর্তমান সরকারের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ- ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে নতুন ভিত্তিতে দাঁড় করানো। সেই ভিত্তি হতে হবে রাষ্ট্রভিত্তিক, প্রাতিষ্ঠানিক এবং স্বার্থনির্ভর। কারণ, টেকসই কূটনৈতিক সম্পর্ক কখনোই ব্যক্তিকেন্দ্রিক হতে পারে না; তা হতে হয় নীতিনির্ভর ও দীর্ঘমেয়াদি।
দিল্লিতে এই সফরকে অনেকে ‘সংলাপের সূচনা’ হিসেবে দেখছেন। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রহ্মণ্যম জয়শঙ্কর এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল-এর সঙ্গে বৈঠকগুলো সেই অর্থেই তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘদিনের জমে থাকা অনিশ্চয়তা ও ভুল বোঝাবুঝি কাটাতে খোলামেলা আলোচনার বিকল্প নেই।
তবে কূটনৈতিক সৌজন্যের বাইরে এসে বাস্তব সমস্যাগুলোর দিকেও নজর দেওয়া জরুরি। সীমান্তে প্রাণহানি, গঙ্গার পানি বণ্টন, ভিসা জটিলতা এবং বাণিজ্য বৈষম্য- এসব ইস্যু বহুদিন ধরেই দুই দেশের সম্পর্কে অস্বস্তির কারণ। বিশেষ করে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রাক্কালে এই বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি শুধু কূটনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত বাস্তবতার সঙ্গেও জড়িত।
একইভাবে সীমান্তে হতাহতের ঘটনাগুলোও জনমনে গভীর প্রভাব ফেলে। এই বিষয়গুলোর দৃশ্যমান অগ্রগতি ছাড়া সম্পর্কের উন্নয়ন সাধারণ মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠা কঠিন।
অন্যদিকে, সহযোগিতার ক্ষেত্রও কম নয়। জ্বালানি খাতে সমন্বয়, আঞ্চলিক যোগাযোগ (কানেক্টিভিটি) বৃদ্ধি এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণ- এসব ক্ষেত্রে পারস্পরিক লাভের সুযোগ রয়েছে। ইতোমধ্যে জ্বালানি আমদানির কিছু উদ্যোগ সেই সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। এসব খাতে বাস্তব অগ্রগতি হলে সম্পর্কের ভিত্তি আরও মজবুত হতে পারে।
ভিসা ইস্যুটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। মানুষে-মানুষে যোগাযোগ বাড়াতে হলে ভিসা প্রক্রিয়াকে সহজ ও কার্যকর করা জরুরি। সাম্প্রতিক সময়ের সীমাবদ্ধতা দুই দেশের নাগরিকদের মধ্যকার স্বাভাবিক যোগাযোগকে ব্যাহত করেছে। ফলে এই ইস্যুতে ইতিবাচক অগ্রগতি প্রত্যাশিত।
এই সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো- বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একটি স্পষ্ট বার্তা দেওয়া: সম্পর্ক হতে হবে রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের, কোনো ব্যক্তি বা দলের সঙ্গে নয়। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের সম্পর্ককে আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও স্থিতিশীল করার এই প্রয়াস সময়োপযোগী।
ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকেও বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং কৌশলগত ভারসাম্যের প্রশ্নে বাংলাদেশের গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ফলে সম্পর্কের টানাপোড়েন দুই দেশের কারও জন্যই দীর্ঘমেয়াদে সুফল বয়ে আনে না- এটি এখন দুই পক্ষই উপলব্ধি করছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফরকে তাই একটি ‘প্রাথমিক পরীক্ষা’ হিসেবেও দেখা যেতে পারে। এখানে প্রত্যাশা যেমন আছে, তেমনি আছে বাস্তবতার সীমাবদ্ধতাও। একটি সফরেই সব সমস্যার সমাধান হবে- এমন আশা করা বাস্তবসম্মত নয়। তবে সংলাপের ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে এবং পারস্পরিক আস্থার পরিবেশ তৈরি হলে অগ্রগতির পথ তৈরি হতে পারে।
সবশেষে প্রশ্নটি থেকেই যায়- এই সফর কি আস্থার নতুন ভিত্তি তৈরি করবে, নাকি তা কেবল কূটনৈতিক সৌজন্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে? উত্তরটি নির্ভর করবে দুই দেশের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, পারস্পরিক সম্মান এবং সবচেয়ে বড় কথা- অমীমাংসিত ইস্যুগুলো সমাধানের আন্তরিকতার ওপর।
ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ভবিষ্যৎ শুধু দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ও সহযোগিতার সঙ্গেও জড়িত। সেই বিবেচনায় এই সফরের গুরুত্ব নিঃসন্দেহে গভীর- এবং এর ফলাফলও হবে বহুমাত্রিক।
ডঃ এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ
লেখক সাংবাদিক কলামিস্ট ও বিশ্লেষক
।। প্রকাশক ও সম্পাদক : মো: শিহাব উদ্দিন ।। নির্বাহী সম্পাদক : জি.এস. জয় ।। বার্তা-সম্পাদকঃ আবু নাছের
দৈনিক জন জাগরণ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত@২০২৬You cannot copy content of this page