সৌভিক পোদ্দার, ঝিনাইদহ
ঝিনাইদহের শৈলকূপা উপজেলার ঐতিহ্যবাহী কুমার নদ আজ অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। একসময় দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নদীপথ হিসেবে পরিচিত কুমার নদ এখন ধীরে ধীরে দখলদারের ও অব্যবস্থাপনার কারণে প্রাণে হীন হয়ে পড়েছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কৃষিখামারিদের দখলে পড়ে নদের স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। ফলে নদের যৌবনে নেমেছে ভাটা।
কুমার নদ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি প্রাচীন নদ। যা মূলত মধুমতি নদী থেকে উৎপন্ন হয়ে ঝিনাইদহ, মাগুরা ও ফরিদপুর জেলার বিভিন্ন এলাকা অতিক্রম করেছে। ঐতিহাসিক এই নদ ছিল স্থানীয় যোগাযোগ, বাণিজ্য ও কৃষির অন্যতম প্রধান মাধ্যম। বিশেষ করে ব্রিটিশ আমল এবং তারও আগে নৌপথে পণ্য পরিবহনের জন্য কুমার নদ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্যমতে, ২০-৩০ (বিশ-এিশ) বছর আগেও কুমার নদে সারা বছর পানির প্রবাহ থাকত। বর্ষা মৌসুমে নদের প্রস্থ অনেক স্থানে ২০০-৩০০(দুইশত-তিনশত)মিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হতো। শুকনো মৌসুমেও নৌযান চলাচল সম্ভব ছিল। নদটি স্থানীয় জেলেদের জন্য মাছের প্রধান উৎস ছিল। আশপাশের কৃষিজমিতে সেচের পানিও সরবরাহ করা হতো।
দখল আর ভরাটের করাল গ্রাস বর্তমানে শৈলকুপা উপজেলার বিভিন্ন অংশে দেখা গেছে, নদের তলদেশে পলি জমে নাব্য কমে গেছে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে, গত কয়েক দশকে নদের গভীরতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। অনেক স্থানে নদ ভরাট হয়ে ছোট খালে পরিণত হয়েছে।
এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে প্রভাবশালী কৃষিখামারিরা নদের ভেতরে বাঁধ দিয়ে চাষাবাদ শুরু করেছেন। কোথাও ধান, কোথাও সবজি চাষ, আবার কোথাও মাছের ঘের তৈরি করা হয়েছে। ফলে নদের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পানি ধারণক্ষমতা কমে যাচ্ছে।
স্থানীয় জেলে আব্দুল মালেক বলেন, আগে প্রতিদিন এই নদ থেকে ৫-৬(পাচ-ছয়) কেজি মাছ ধরতাম। এখন সারাদিন জাল ফেলেও ১(এক) কেজি মাছ পাওয়া কঠিন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নদের দখল ও নাব্য হ্রাসের কারণে জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মাছের প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস হচ্ছে। পানির স্বাভাবিক প্রবাহ না থাকায় দূষণের মাত্রাও বাড়ছে। এর ফলে স্থানীয় কৃষি ও জনজীবনে বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, কুমার নদ রক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। নদের অবৈধ দখল উচ্ছেদ, নিয়মিত খনন কার্যক্রম পরিচালনা এবং নদীর তীর সংরক্ষণে পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
উপজেলা প্রশাসনের একাধিক সূত্র জানায়, নদের দখল ও ভরাটের বিষয়টি তাদের নজরে রয়েছে। শিগগিরই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
একসময় শৈলকুপার প্রাণ ছিল কুমার নদ। ইতিহাস ও ঐতিহ্যে ভরপুর এই নদ আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। এখনই যদি যথাযথ উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যতে কুমার নদ কেবল মানচিত্র আর স্মৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে।
।। প্রকাশক ও সম্পাদক : মো: শিহাব উদ্দিন ।। নির্বাহী সম্পাদক : জি.এস. জয় ।। বার্তা-সম্পাদকঃ আবু নাছের
দৈনিক জন জাগরণ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত@২০২৬You cannot copy content of this page