
সাধন সাহা জয়-ব্রাহ্মণবাড়িয়া :
‘হয় ইজারা বাতিল করেন, নয় আমাগোরে মাইরা ফালান’
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার চরলাপাং এলাকায় খননযন্ত্র দিয়ে মেঘনা নদী থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।
‘হয় আমাগো এলাকায় অহনই পুলিশ ক্যাম্প বসান, নয় বালুর ইজারা এক্কেবারে বন্ধ কইরা দেন। আর হেইডাও না পারলে, আমাগোরে অহনই গুলি কইরা মাইরা থুইয়া যান।’
কথাগুলো বলছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার নদীতীরবর্তী চরলাপাং গ্রামের বাসিন্দা সফর মিয়া। গত রবিবার (২২ ফেব্রুয়ারি) বালু কারবারিদের গুলিতে ওই গ্রামের ১০ জন বাসিন্দা আহত হওয়ার পর ওই এলাকা থেকে বালু উত্তোলনের ইজারা অবিলম্বে বাতিল করার দাবি জানিয়েছে এলাকাবাসী।
ঘটনার পর চরলাপাং এলাকায় পুনরায় বালু সন্ত্রাসীদের হামলার আশঙ্কায় ভীতসন্ত্রস্ত সফর মিয়া আজ মঙ্গলবার ক্ষোভ প্রকাশ করে বালু উত্তোলনের ইজারা বন্ধের দাবি জানান এ প্রতিবেদকের কাছে।
এ ব্যাপারে নদী ও প্রকৃতি নিয়ে কাজ করা সংগঠন তরী বাংলাদেশ- এর আহ্বায়ক শামীম আহমেদ, শিক্ষক নেতা আলী আহমেদ মীর, সাংবাদিক নেতা শাহীন রেজা টিটুসহ স্থানীয় অনেকেই জনস্বার্থে বালুর ইজারা দ্রুত বন্ধের দাবি জানান। একইসঙ্গে গুলি করে আহত করার ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানান তাঁরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নবীনগর উপজেলার পশ্চিমাঞ্চলে থাকা মেঘনা নদী থেকে আগামী ১৩ এপ্রিল (৩০ চৈত্র) পর্যন্ত এক বছরের জন্য নাসিরাবাদ বালু মহাল থেকে বালু উত্তোলনের ইজারা পান নবী নগর উপজেলার শ্যামগ্রাম ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন পায়েল।
অভিযোগ রয়েছে, ইজারার শর্ত ভেঙে শতাধিক ড্রেজার (খননযন্ত্র)-এর মাধ্যমে দিন-রাত বালু উত্তোলন করছে ইজারাদারের লোকজন। গ্রামবাসী এর প্রতিবাদ করলে ইজারাদারের অস্ত্রধারী লোকজন এলাকায় ভয়ের রাজত্ব কায়েম করে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, ইজারার শর্ত ভঙ্গ করে বালু উত্তোলন করায় নদীতীরবর্তী চরলাপাং গ্রাম ও এর আশপাশের গ্রামগুলো ভয়াবহ নদীভাঙনের কবলে পড়ছে। এ নিয়ে গ্রামবাসী জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেও কোনো প্রতিকার পায়নি।
গ্রামবাসীর অভিযোগ, প্রত্যেক ড্রেজারের সঙ্গে থাকা অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা চরলাপাং ও আশপাশের গ্রাম থেকে প্রকাশ্যে দিনের বেলায় মাটি কাটার পাশাপাশি অন্যের জমি থেকে ফসল কেটে নিয়ে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রবিবার (২২ ফেব্রুযারি) সকালে ইজারাদারের অস্ত্রধারীরা চরলাপাং এলাকায় জোর করে মাটি ও ফসল কাটতে এলে গ্রামবাসী তাতে বাধা দেয়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে গ্রামবাসীর ওপর সন্ত্রাসীরা অতর্কিতে গুলি চালালে গ্রামের অন্তত ১০ জন বাসিন্দা গুলিবিদ্ধ হন। খবর পেয়ে জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (নবীনগর সার্কেল) পিয়াস বসাক পুলিশের একটি দল নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেন।
স্থানীয়রা জানায়, গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তৎকালীন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাহাদৎ হোসেন শোভন এক বছর মেয়াদে নবীনগরের নাসিরাবাদ বালু মহাল প্রথমে ৯ কোটি টাকায় ইজারা নেন।
এর এক বছর পরই একই বালু মহাল ৭২ কোটি টাকায় ইজারা নেন একই ব্যক্তি। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বালু মহালটির ইজারা পান স্থানীয় বিএনপি নেতা সাখাওয়াত হোসেন পায়েল।
বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে ইজারাদার শ্যামগ্রাম ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন পায়েলের মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি তা ধরেননি।
এ ব্যাপারে নবীনগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সংসদ সদস্য অ্যাড. এম এ মান্নান আজ মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে সাংবাদিকদের বলেন, ‘বালু সন্ত্রাস চিরতরে বন্ধ করা আমার নির্বাচনী ওয়াদা ছিল। সুতরাং জনস্বার্থে যে কোনো মূল্যে বালুর ইজারা বন্ধে দ্রুত উদ্যোগ নেব।' ইজারাদার সম্পর্কে তিনি বলেন, ইজারাদারের সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের গুলিতে গ্রামবাসী আহত হয়েছে। ফলে সে (সাখাওয়াত হোসেন পায়েল) আর কোনো দলের হতে পারে না। সে সরাসরি সন্ত্রাসী। তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক শারমিন আক্তার জাহান সাংবাদিকদের বলেন, 'বতর্মান ইজারার মেয়াদ রয়েছে আর দুই মাস। জনস্বার্থে আমরা ভবিষ্যতে শুধু ইজারা বাতিল নয়, ইজারার নিয়ম লঙ্ঘনের প্রমাণ পেলে এই দুই মাসের ইজারাও বন্ধ করব।
এদিকে ইজারাদারের সন্ত্রাসীদের গুলিতে ১০ জন আহত হওয়ার ঘটনায় আজ মঙ্গলবার দুপুরে এ প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্তে কেউ গ্রেপ্তার হয়নি। এ নিয়ে এলাকায় জনমনে ক্ষোভ বাড়ছে।
এ বিষয়ে নবীনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম আজ দুপুরে সাংবাদিকদের বলেন, গোলাগুলির ঘটনায় এখন পর্যন্ত কেউ মামলা করেননি। মামলা হলে প্রযোজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে চরলাপাং এলাকার জনগণের নিরাপত্তার স্বার্থে সেখানে গতকাল থেকেই পুলিশের টহল বাড়ানো হয়েছে।
।। প্রকাশক ও সম্পাদক : মো: শিহাব উদ্দিন ।। নির্বাহী সম্পাদক : জি.এস. জয় ।। বার্তা-সম্পাদকঃ আবু নাছের
দৈনিক জন জাগরণ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত@২০২৬You cannot copy content of this page